লতা মঙ্গেশকরের মতোই কণ্ঠই একসময় অভিশা’প হয়ে উঠেছিল শ্রেয়া ঘোষালের জীবনে! তারপর কী ঘটেছিল যে বদলে গেল সবকিছু? যার কন্ঠে মুগ্ধ হন প্রতিদিন, জানেন কী লড়াই করতে হয়েছিল তাঁকে?

ভারতের সংগীত জগতে এমন কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো শুনলেই আলাদা করে চেনা যায়। সেই তালিকার অন্যতম নাম শ্রেয়া ঘোষাল( Shreya Ghoshal)। অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠ, নিখুঁত উচ্চারণ এবং আবেগে ভরা গায়কির জন্য তিনি আজ কোটি কোটি শ্রোতার প্রিয়। কিন্তু এই সাফল্যের গল্প কোনওদিনই একদিনে তৈরি হয়নি। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে তার এই যাত্রা।

১৯৮৪ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন শ্রেয়া ঘোষাল। বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল ছিলেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের ইঞ্জিনিয়ার এবং মা শর্মিষ্ঠা ঘোষাল সাহিত্যের চর্চা করতেন। খুব ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেন, অন্য বাচ্চাদের মতো খেলাধুলায় নয়—তার বেশি আগ্রহ সুরে। যখন সমবয়সীরা মাঠে খেলত, তখন ছোট্ট শ্রেয়া ব্যস্ত থাকতেন গানের রেওয়াজে। এই নিয়মিত সাধনাই একদিন তাকে ভারতের অন্যতম সেরা কণ্ঠশিল্পী করে তুলবে—তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সংগীতের প্রতিযোগিতা আজকের মতো এত বেশি ছিল না। সেই সময় একটি জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শ্রেয়া। তার কণ্ঠ শুনে বিচারকদের পাশাপাশি দর্শকেরাও মুগ্ধ হয়ে যান। সেই মঞ্চেই একদিন শ্রেয়ার প্রতিভা লক্ষ্য করেন বিখ্যাত গায়ক সোনু নিগম। তিনি শ্রেয়ার বাবাকে পরামর্শ দেন, মেয়েকে মুম্বইয়ে নিয়ে গেলে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হতে পারে। এই উৎসাহই ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়। ধীরে ধীরে সংগীত জগতের বড় বড় মানুষের নজরে আসতে শুরু করেন শ্রেয়া। কিন্তু তখনও তিনি কেবল একজন স্কুলছাত্রী, যার মনে ছিল শুধু গান গাওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন যে এত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে, তা তখনও জানা ছিল না।

একসময় বিখ্যাত পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভণশালী (Sanjay Leela Bhansali) একটি পুরনো অডিও শুনছিলেন। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন এটি কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের এর কণ্ঠ। কিন্তু পরে জানা যায়, সেটি আসলে এক তরুণী গায়িকার গান। তখন তার নতুন ছবি দেবদাস–এর জন্য একটি তরুণ কণ্ঠের প্রয়োজন ছিল। খোঁজ শুরু হয় সেই অচেনা গায়িকাকে নিয়ে, আর খুব শিগগিরই পৌঁছে যায় খবর—সেই কণ্ঠের মালিক শ্রেয়া ঘোষাল।
একটি ফোনকলেই বদলে যায় ১৬ বছরের এক স্কুলছাত্রীর জীবন। রেকর্ডিং স্টুডিওতে দাঁড়িয়ে সামনে দেশের নামী গায়করা, কিন্তু পরিচালক সঞ্জয় তাকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন—তুমি পারবে, অন্য কারও কথা শোনার দরকার নেই। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তিনি গেয়ে ফেলেন ছবির গান। এরপর ইতিহাস—প্রথম ছবিতেই ব্যাপক সাফল্য, আর মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার।

তবে সাফল্যের সঙ্গেও আসে নতুন চ্যালেঞ্জ। বলিউডে একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে—যে গায়কের কণ্ঠ একটু আলাদা বা অসাধারণ, তাকে প্রায়ই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। শ্রেয়া ঘোষালের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল। অনেকেই বলতেন, তার কণ্ঠ নাকি পুরো লতা মঙ্গেশকরের মতো। প্রথমে এটি প্রশংসা মনে হলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন, এই তুলনা তার নিজের পরিচয়কে আড়াল করে দিতে পারে। শ্রেয়া লতা মঙ্গেশকরকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু তিনি চাননি কেবল কারও ছায়া হয়ে থাকতে। তাই নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ার চেষ্টা শুরু করেন। ভালোবাসার মধুর গানের পাশাপাশি তিনি নাচের গান, কঠিন শাস্ত্রীয় সংগীত—সব ধরনের গান গাইতে শুরু করেন। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি হয় তার নিজস্ব পরিচয়, যেখানে শ্রেয়া ঘোষাল শুধুই শ্রেয়া ঘোষাল।

আরও পড়ুনঃ দু’হাতে ১৮টি সেলাই! র*ক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে অভিনেত্রী স্বর্ণকমল দত্ত! গত বছর স্বামীর নি’র্যাতনে ভেঙেছিল সংসার, এবার শি’কার ভয়াবহ দুর্ঘটনা! কী করে ঘটল এমন বিপদ? এখন কেমন আছেন তিনি?

আজ শ্রেয়া ঘোষাল কেবল ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। তার কণ্ঠে অসংখ্য হিট গান শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সংগীতের কোনও সীমানা নেই। তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে ২০১০ সালের ২৬ জুন আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্যে দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে “শ্রেয়া ঘোষাল দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন সাধারণ স্কুলছাত্রী থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হয়ে ওঠার এই যাত্রা তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার এক অনন্য উদাহরণ।

You cannot copy content of this page