প্রকাশ্যে সবসময়ই সাদামাটা জীবনযাপনের ছবি তুলে ধরেছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাদা খোলের সুতির শাড়ি, পায়ে হাওয়াই চপ্পল এবং কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই পরিচিত চেহারার খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে সাংসদ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং টানা তিনবার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন সব ক্ষেত্রেই তাঁর পোশাক-আশাকে ছিল একই সরলতা। তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তাঁকে নিয়ে একাধিক জল্পনা ছড়িয়েছিল। বিশেষ করে রূপচর্চা ও মেকওভার নিয়ে নানা গুঞ্জন রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে আসে। সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ধরনের পরাজয়ের পর সেই পুরনো জল্পনা আবার নতুন করে সামনে এসেছে। একসময় ২১৩ আসন পাওয়া দল এবার নেমে এসেছে ৮০-তে। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর মমতার চেহারায় ক্লান্তি ও মানসিক চাপের ছাপ স্পষ্ট বলে দাবি করছেন অনেকেই। সেই থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, নির্বাচনে ভরাডুবির ধাক্কায় কি রূপচর্চা বন্ধ করে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে কলকাতার পরিচিত কসমেটোলজিস্ট কেয়া শেঠের নাম। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রূপচর্চার সঙ্গে নাকি যুক্ত ছিলেন তিনি। এমনকি একটি বড় দল নিয়ে নিয়মিত কালীঘাটের বাড়িতে যেতেন বলেও নানা সময়ে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এতদিন এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এবার সরাসরি মুখ খুললেন কেয়া শেঠ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপচর্চা নিয়ে যে গল্প প্রচলিত রয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর কথায়, এই গুজবের কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং একটি ভুল ব্যাখ্যা থেকেই বিষয়টি এত দূর গড়িয়েছে। তিনি বলেন, বহু বছর আগে একটি সংবাদমাধ্যম তাঁকে প্রশ্ন করেছিল সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে নিজেদের ত্বক ও চেহারার যত্ন নিতে পারেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি কিছু সাধারণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে সেই বক্তব্যকেই বিকৃত করে প্রচার করা হয় যে, তিনি নাকি ভবিষ্যতের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রূপচর্চার দায়িত্বে রয়েছেন।
কেয়া শেঠের দাবি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গুজব আরও বড় আকার নেয় এবং তাঁকে কার্যত তৃণমূল নেত্রীর ‘মেকআপ আর্টিস্ট’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না বলেই জানিয়েছেন তিনি। নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর অনেক নেতা-নেত্রী দল ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক শিবিরে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন কেয়া। তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনও তৃণমূলের সঙ্গে ছিলেন না, তাই এখন দল হেরে যাওয়ার পর অবস্থান বদলানোর প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, তাঁকে কেউ কখনও তৃণমূল নেত্রীর পাশে মঞ্চে দেখেননি, কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখেননি কিংবা দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে দেখেননি। তাই তাঁর সঙ্গে মমতার বিশেষ সম্পর্কের দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে করেন তিনি।
তবে এই গুজব কীভাবে ছড়িয়েছিল, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন কেয়া শেঠ। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল নেত্রীর আশপাশের কিছু মানুষই নানা সময়ে এই ধরনের কথা প্রচার করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ব্যবসায়িক জীবনের নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, কালীঘাটে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সামনে ডাস্টবিন তৈরি করা থেকে শুরু করে বারুইপুরে বিদ্যুতের ঘাটতি কিংবা সিঙ্গুরে প্রকল্প আটকে যাওয়ার মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। যদি সত্যিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকত, তাহলে এই সমস্যাগুলোর সহজ সমাধান হয়ে যেত বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোনও সুবিধা তিনি কখনও পাননি।
আরও পড়ুনঃ ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে বানিয়েছিল বাংলার ‘মহানায়ক’, তারকা খ্যাতির শীর্ষে থেকেও কেন একমাত্র ছেলে গৌতম চ্যাটার্জীকে অভিনয় করতে দেননি উত্তম কুমার? সুযোগ ছিল হাতের মুঠোয়, তবু মহানায়কের সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের কারণ জানলে অবাক হবেন!
তবে সব অভিযোগ ও গুজব খারিজ করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রসঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ জানাতে পিছপা হননি কেয়া শেঠ। তাঁর মতে, বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা মানুষের চেহারায় প্রভাব ফেলতেই পারে। দীর্ঘদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পর হঠাৎ সেই অবস্থান হারালে মানসিক আঘাত পাওয়া স্বাভাবিক, আর সেই চাপ মুখের অভিব্যক্তিতেও ফুটে উঠতে পারে। তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রূপচর্চা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। সাধারণ মানুষ হোক বা কোনও রাজনৈতিক নেতা, কে কীভাবে নিজের যত্ন নেবেন, তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে নতুন সরকারের কাছেও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন কেয়া শেঠ। তাঁর আশা, নতুন প্রশাসন বাংলায় ব্যবসা ও শিল্পের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।






