বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এমন কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের ছাড়া একটা সময় কল্পনাই করা যেত না। ঠিক তেমনই এক অবিচ্ছেদ্য নাম সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। যে কণ্ঠ ছাড়া মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের ঠোঁট নড়লেও প্রাণ পেত না দৃশ্য, যে স্বরে আকাশবাণীর ভোর হয়ে উঠত মায়াবী, তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, ছিলেন এক যুগের অনুভূতি। সংগীতই ছিল তাঁর সাধনা, সংগীতই ছিল তাঁর আত্মসম্মান।
শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে আধুনিক গান, সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বকীয়তা রেখে গিয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর গান মানেই আবেগের গভীরতা, সূক্ষ্ম অনুভব আর নিখুঁত প্রকাশ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দ্বৈত গানের কেমিস্ট্রি আজও বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে অমলিন। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি ছবিতেও তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
দীর্ঘ ৭৫ বছরের সংগীতজীবনে অগণিত কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন তিনি। ১৯৭১ সালে ‘জয়জয়ন্তী’ ও ‘নিশিপদ্ম’ ছবিতে গান গেয়ে শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ উপাধিতে সম্মানিত করে। তবুও তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে জন্ম নেয় এক গভীর অভিমান।
কারণ, একই সময়ে লতা মঙ্গেশকরের মতো শিল্পীরা বহু আগেই ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ভারতরত্ন’ পেয়েছেন, অথচ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত থেকেছেন দীর্ঘদিন। সেই মানুষটিকেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে পদ্মশ্রী দেওয়ার প্রস্তাব—এই অসম্মান তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর কাছে এটি ছিল স্বীকৃতির নয়, অবহেলার প্রতীক।
আরও পড়ুনঃ মেদিনীপুরের অনুষ্ঠানে চরম হেনস্থার শিকার গায়ক! গায়কের সঙ্গে কু’কুরের মতন ব্যবহার! ধাক্কা খেয়ে ক্ষুব্ধ সারেগামাপা-খ্যাত স্নিগ্ধজিৎ!
শুধু রাষ্ট্রীয় পুরস্কার নয়, সংগীত জগতের পরিবর্তনও তাঁকে ধীরে ধীরে নীরব করে দিয়েছিল। একসময় যেখানে মেলোডি আর কণ্ঠ ছিল মুখ্য, সেখানে বাদ্যযন্ত্রের আধিক্য তিনি মানতে পারেননি। তাই নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলেন সংগীত থেকে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দর্শকের ভালোবাসাই শিল্পীর আসল পুরস্কার। সেই বিশ্বাস নিয়েই ২০২২ সালে তিনি চলে যায় নক্ষত্রের দেশে। শুধুমাত্র দর্শকদের জন্য রেখে গেলেন কণ্ঠ, আত্মসম্মান আর এক অমর উত্তরাধিকার।






