বিনোদন জগত মানেই যেন আলো ঝলমলে এক দুনিয়া। ক্যামেরার সামনে তারকাদের হাসি, সাফল্য আর করতালির শব্দে ভরে থাকে চারপাশ। কিন্তু এই ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা গল্প, সংগ্রাম আর ত্যাগের ইতিহাস। অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা নিজের জীবন উৎসর্গ করে দর্শকদের আনন্দ দিয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাপ্য সম্মান পাননি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমনই এক নাম অনুপ কুমার (Anup Kumar), যাঁর অভিনয় মানুষকে হাসিয়েছে, কিন্তু তাঁর নিজের জীবনের গল্পে রয়েছে অজস্র অজানা অধ্যায়।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে বহু অভিনেতা এসেছেন এবং গেছেন, কিন্তু কিছু নাম আজও মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে আছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অভিনেতা অনুপ কুমার। ইন্ডাস্ট্রির সবার প্রিয় “অনুদা” নামে পরিচিত এই অভিনেতা তাঁর স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি ও সহজাত কৌতুক প্রতিভা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। নায়ক কিংবা পার্শ্বচরিত্র যে ভূমিকাতেই অভিনয় করেছেন, নিজের অভিনয় দক্ষতায় সেটিকে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন। বহু ছবিতে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের জন্য বাড়তি আনন্দের নিশ্চয়তা।
১৯৩০ সালের ১৭ জুন কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন অনুপ কুমার। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সত্যেন দাস। তাঁর বাবা ধীরেন্দ্রনাথ দাস ছিলেন একজন গায়ক ও অভিনেতা। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে খুব অল্প বয়সেই অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেন তিনি। মাত্র আট বছর বয়সে ধীরেন গাঙ্গুলীর পরিচালিত চলচ্চিত্র হালখাতা ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর ধীরে ধীরে টলিগঞ্জের চলচ্চিত্র জগতে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি।
অনুপ কুমারকে অনেকেই কৌতুক অভিনেতা হিসেবে মনে রাখলেও তাঁর অভিনয়ের পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। তরুণ মজুমদারের বরযাত্রী ছবির পর থেকেই তিনি মূলত কমেডি চরিত্রে বেশি পরিচিতি পান। তবে পলাতক, ঠগিনী ও নিয়ন্ত্রণ ছবিতে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি একজন শক্তিশালী নায়ক হিসেবেও সমান দক্ষ। বসন্ত বিলাপ, দাদার কীর্তি, বালিকা বধূ সহ বহু জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে রয়ে গেছে। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ নাট্য পরিচালকও এবং নিজের নাট্যদল “ভদ্রকালী নাট্যচক্র” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ ভোটের মুখে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ অভিনেত্রী সোনামনি সাহা! শাসক দলকে সমর্থন করে কনটেন্টের মুখ তিনি! ‘ঠিক এগোচ্ছেন, এভাবে চললে তবেই টিকিট মিলবে!’—অভিনেত্রীকে তীব্র কটা’ক্ষ নেটপাড়ার!
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অনুপ কুমার বহু সম্মান অর্জন করেছিলেন। ‘পলাতক’ ছবির জন্য তিনি বিএফজে পুরস্কার পান (BFJA awards) এবং ‘নিয়ন্ত্রণ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে দ্বীনবন্ধু পুরস্কারে সম্মানিত করে। তবুও জীবনের শেষদিকে তাঁর মনে এক ধরনের আক্ষেপ ছিল—বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তাঁকে হয়তো প্রাপ্য সম্মান পুরোপুরি দিতে পারেনি। ১৯৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে স্টুডিওতে নিয়ে যাওয়া হয়নি। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের অসংখ্য ছবিতে তিনি নিজের অভিনয় দিয়ে অন্যদের অভিনয়ের ঘাটতিও পূরণ করেছেন। তাই বলা যায়, বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ আজও তাঁর কাছে এক অর্থে চিরঋণী।






