বাংলার সংস্কৃতিতে মঞ্চভিত্তিক অনুষ্ঠান বা যাকে অনেকেই সহজভাবে ‘মাচা অনুষ্ঠান’ (Stage Show) বলে ডাকেন, তার কিন্তু একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই এই ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ শিল্পীদের কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছেন। পাড়ার ক্লাবের অনুষ্ঠান হোক, মেলা বা উৎসব, একটা ছোট্ট স্টেজেই গান-নাচ, অভিনয় বা আবৃত্তির মাধ্যমে তৈরি হয় আনন্দের পরিবেশ। বড় বড় অডিটোরিয়াম বা টেলিভিশনের আলোঝলমলে সেটের বাইরে এই মঞ্চই বহু শিল্পীর প্রথম পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছে।
তাই অনেকের কাছেই এই মঞ্চ কেবল একটা অস্থায়ী স্টেজ নয়, বরং শিল্পচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গাও। এই প্রসঙ্গেই সম্প্রতি গায়িকা কেকা ঘোষাল (Keka Ghoshal) একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতির কথা খোলাখুলি ভাগ করে নিলেন। তিনি বলেন, “আমি অনেককে বলতে শুনি, তাঁরা স্টেজকে ‘মাচা’ বলে। আরও অনেক কিছু বলে ছোট করে, মঞ্চে উপস্থাপনা করা শিল্পীদের খাটো দেখায়। সত্যি বললে, আমার খুব কষ্ট হয়। বলতে ইচ্ছা করে, মঞ্চে প্রতিটা অনুষ্ঠানে যে পরিমাণ টাকা পাওয়া যায়।
View this post on Instagram
সেটা দিয়েই কিন্তু এইসব বড় বড় কথা বলা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংসার চলে। কারণ, আমার মতো একজন গায়িকা অথবা ছোটখাটো শিল্পীরা রেকর্ডিং বা চরিত্র থেকে কী পরিমাণ টাকা আয় করে সেটা জানা আছে। তাই যেটা দিয়ে সংসার চলে, বাড়ি-গাড়ি সবকিছু হয়, সেটাকে অপমান করা সাজে না। বলতে লজ্জা নেই, একসময় মঞ্চই আমার পেট চালিয়েছে।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, এই ধরনের মন্তব্য শুনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কতটা আঘাত পেয়েছেন এবং সেই থেকেই মঞ্চের প্রতি অবহেলা নিয়ে সরব তিনি।
প্রসঙ্গত, কেকা ঘোষালের বক্তব্য অনেকের কাছেই বাস্তবতার কাছাকাছি লেগেছে। কারণ, বিনোদন জগতের অনেক শিল্পীর ক্ষেত্রেই মঞ্চে অনুষ্ঠান করা একটা বড় আয়ের উৎস। টেলিভিশন বা রেকর্ডিংয়ের কাজ সবসময় নিয়মিত থাকে না, কিন্তু উৎসবের মরশুমে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করে অনেকেই ভালো পারিশ্রমিক পান। এই অনুষ্ঠানগুলো শুধু অর্থ উপার্জনের সুযোগই দেয় না, শিল্পীদের সরাসরি দর্শকের সামনে পারফর্ম করার অভিজ্ঞতাও দেয়।
আরও পড়ুনঃ অভিনেতা হওয়ার জেদে একসময় স্টেশনে কাটিয়েছেন রাত! বিগ বস বাংলার ফাইনালিস্ট স্যান্ডি, এবার বড় পর্দায় ‘পরবর্তী স্টেশন বেগুনকোদর’-এ! কবে আসছে ছবিটি পর্দায়?
সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনা আরও বেশি সামনে এসেছে অভিনেত্রী শ্বেতা ভট্টাচার্যের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি বেশকিছু মাস আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে মাচা অনুষ্ঠান করতে তাঁর ভালো লাগে না, তবে দায়িত্ব ও অর্থের প্রয়োজনের কারণে এই ধরনের শো করতে হয়। এই বক্তব্যের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক দর্শক মনে করেন, শব্দচয়নটা হয়তো আরও ভদ্রভাবে করা যেত। কারণ, যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিল্পীরা নিজেদের প্রতিভা দেখান, সেটাকে অনেকেই সম্মানের চোখে দেখেন।
আসলে বিষয়টা শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের নয়, বরং শিল্পের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও জড়িত। বড় মঞ্চ হোক বা ছোট স্টেজ, দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে শিল্প পরিবেশন করাটাই মূল কথা। কেকা ঘোষালের বক্তব্য থেকে সেই অনুভূতিটাই যেন সামনে এসেছে। তাঁর মতে, যে মঞ্চ বহু শিল্পীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাকে হালকাভাবে দেখার আগে একটু ভাবা দরকার। আর সেই কারণেই মঞ্চ বা ‘মাচা’ নিয়ে সাম্প্রতিক এই বিতর্কে অনেকেই মনে করছেন, শিল্পীদের কথাবার্তায় সংযম ও সম্মানবোধ থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।






“মঞ্চকে ‘মাচা’ বলে অপমান করবেন না…এই টাকা দিয়েই যেমন আমার পেট চলেছে, অনেকের বাড়ি-গাড়িও হয়েছে” শিল্পী হয়েও অন্যের শিল্প সাধনাকে তাচ্ছিল্য! মঞ্চভিত্তিক অনুষ্ঠানকে ছোট করে দেখার প্রবণতা নিয়ে সরব, গায়িকা কেকা ঘোষাল!