আজ সকালে সংগীতপ্রেমীদের মন ভারাক্রান্ত করে চলে গেলেন কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে। তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অমূল্য রত্ন হয়ে থাকবে। তাঁর প্রতিটা গানের পেছনে রয়েছে অনেক গল্প এবং না বলা কথা। তেমনই ১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা তিনি ভাগ করেছিলেন বহু বছর পর। দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে গান গাইতে এসে দিদি লতা মঙ্গেশকর যখন “অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ” গাইছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।
সেই গানটি দেশবাসীকে এক অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। তবে পরে জানা যায়, এই বিখ্যাত গানটি আসলে আশা ভোঁসলের জন্য তৈরি হয়েছিল, কিন্তু এক বিশেষ কারণে তা লতার কণ্ঠে গাওয়া হয়! প্রসঙ্গত, গানটির সুরকার সি. রামচন্দ্র এবং গীতিকার প্রদীপ সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন যে, “অ্যায় মেরে ওয়াতন” প্রথমে আশা ভোঁসলের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। গানটির প্রাথমিক মহড়া শুরু হয়েছিল আশা ভোঁসলের সঙ্গে। এমনকি সুরও আশার কণ্ঠের জন্য তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু সেই সময় সি. রামচন্দ্র এবং লতা মঙ্গেশকরের মধ্যে একটা মনোমালিন্য চলছিল, যার কারণে লতা এই প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করেননি। বিষয়টি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন প্রদীপ গীতিকার জেদ ধরেন যে, এই গানটির পূর্ণতা লতার কণ্ঠেই আসবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই গম্ভীর এবং হৃদয়স্পর্শী গানটি লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠেই সেরা হবে। এদিকে, গানটি গাইতে লতা মঙ্গেশকর রাজি হওয়ার পর আশা ভোঁসলে এই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ান। যদিও শোনা যায়, প্রথমে গানটি দুই বোনের ডুয়েট হবে বলে পরিকল্পনা ছিল।
তবে লতা এককভাবে গানটি গাইতে চাইলে আশা সিদ্ধান্ত নেন গানটি থেকে পিছিয়ে আসবেন। সুরকার এবং গীতিকারদের আগ্রহ ছিল যে, গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে। এবং লতার গায়কীই তা সম্ভব করেছিল। পরবর্তীতে গানটি যখন দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে পরিবেশন করা হয়, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নেহরু আবেগঘন হয়ে বলেন, “বেটি, আজ তুমনে মুঝে রুলা দিয়া।” তবে, মজার বিষয় হলো, সেই বিশেষ অনুষ্ঠানে সি. রামচন্দ্র এবং লতা মঙ্গেশকর একে অপরের সাথে কথাই বলেননি।
এমনকি গানটির মহড়া ছিল আলাদাভাবে, তাদের মধ্যে তিক্ততার কারণে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আশা ভোঁসলে এই ঘটনা সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই গানটি আমার কেরিয়ারের অন্যতম এক আফসোস। আমি জানি, এই গানটি লতা দিদির কণ্ঠেই সেরা হয়েছিল, তবে এটি যে আমি গাইতে পারতাম না, এমন নয়।” আজ ৯২ বছর বয়সী আশা ভোঁসলে নিয়ে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। গত কয়েকদিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থা একটু অবনতি হয়েছে, তবে তার দ্রুত সুস্থতার জন্য দেশজুড়ে ভক্তরা প্রার্থনাও করছিলেন, সব যেন বিফলে গেল!
আরও পড়ুন: প্রয়াত কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে! ৯২ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগে, সঙ্গীত জগতের এক যুগের সমাপ্তি!
উল্লেখ্য, আশা ভোঁসলের ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে জন্ম এবং ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীতের সাধনা করেছেন। তাঁর গাওয়া গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। হিন্দি, মারাঠি, ইংরেজি, এবং অন্যান্য ভাষায় তাঁর কণ্ঠে বহু গান জনপ্রিয় হয়েছে। ২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। সঙ্গীত জগতে এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে সক্ষম হয়েছেন পরিশ্রম এবং প্রতিভার জন্য। তাঁর গাওয়া গানগুলোর মধ্যে “প্যায়ার কা পাহেলা কদম”, “মেরা সুন্দর স্বপ্ন” এবং “রাহে তো কোঁই, মেরা আহি” আজও শ্রোতাদের মনে গেঁথে রয়েছে। তার অবদান সঙ্গীতজগতের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।






