মনে আছে, ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অপনা দেশ’ ছবির জনপ্রিয় গান ‘দুনিয়া মেঁ লোগো কো…’? গানটি কম্পোজ করেছিলেন সঙ্গীত মহারথী রাহুল দেব বর্মন (আরডি বর্মন), তথা আশা ভোঁসলের জীবনসঙ্গী। এই গানে আশার কণ্ঠে যে শক্তি তা আজও স্মরণীয়। আশার গানে ছিল এক ধরনের দাপট, যা অন্য গায়িকাদের থেকে তাকে আলাদা করে তুলেছিল। সঙ্গীতের দুনিয়ায় আশার ভূমিকা এক অনন্য, কারণ তিনি কেবল তার কণ্ঠ দিয়েই নয়, তার জীবনযাপন দিয়েও আমাদের কাছে বিশেষ। গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, সুমন কল্যাণপুরের মতো গায়িকাদের মাঝে আশা ছিলেন এক ভিন্ন রকমের গায়কী। তার কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য ছিল সত্যিই অসাধারণ।
আশা ভোঁসলে, যার পুরো নাম আশা মঙ্গেশকর, সঙ্গীতশিল্পী দীননাথ মঙ্গেশকরের কন্যা। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবা দীননাথের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সে সময় তার বড় বোন লতা ছিলেন মাত্র ১৩ বছর বয়সে। বাবা হারানোর পর পরিবারকে সহায়তা করার জন্য আশাকে পেশাদারী সঙ্গীত জগতে নামতে হয়। ১৯৪৩ সালে একটি মারাঠি ছবির গানে তার গানের যাত্রা শুরু, এবং ১৯৪৯ সালে তার প্রথম হিন্দি গান ‘রাত কি রানি’ সাড়া ফেলেছিল। আশার গান এবং তার সঙ্গীতজীবন এমন এক অধ্যায় যা আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
আশার জীবন ছিল জটিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সঙ্গীতকার গণপতরাও ভোঁসলের সাথে বিয়ে করেন। এই বিয়ে নিয়ে মঙ্গেশকর পরিবার সন্তুষ্ট ছিল না, তবে তাতে কিছু যায় আসে না। আশার প্রেম ছিল আবেগের মূর্ত প্রতীক, কিন্তু সুখী হয়নি সে সম্পর্ক। গণপতরাওয়ের মানসিক নির্যাতন সহ নানা কারণে তিনি তার প্রথম সংসার ভাঙেন। তারপরেও তার জীবন এগিয়ে চলে, সন্তানদের জন্ম হয় এবং এক পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৬০ সালে তার গণপতরাওয়ের সাথে বিচ্ছেদ হয়, কিন্তু আশার পদবি ‘ভোঁসলে’ তিনি ছাড়েননি।
১৯৮০ সালে আরডি বর্মনের সাথে আশার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এই বিয়েও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সমর্থন পায়নি, তবে নিজেদের ভালোবাসার জন্য তারা একে অপরকে গ্রহণ করেন। আশার কণ্ঠে ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘মেরা কুছ সামান’, ‘ইয়ে মেরা দিল’ এর মতো অসংখ্য হিট গান সৃষ্টি হয়। তাদের সম্পর্ক ছিল এক ধরনের শক্তি, যা সঙ্গীত জগতে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিল। তবে, কিছুদিন পর আরডি বর্মনের শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাদের মাঝে দূরত্ব বাড়ে। ১৯৯৪ সালে রাহুল দেব বর্মন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, তারপরেও আশা একা হয়ে তার জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যান।
আরও পড়ুনঃ ‘বকেয়া টাকা মা’রলে ছাড় নেই একদম!’ ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে হুঁশিয়ারি আর্টিস্ট ফোরামের! কনীনিকার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে জের! লীনার ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ ও ‘অর্গানিক স্টুডিও’কে, সকল শিল্পীদের পারিশ্রমিক পরিশোধের কড়া নির্দেশ!
আশার জীবনে তখন আরও এক বিপর্যয় আসে। তার মেয়ে বর্ষা, মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। ২০১২ সালে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। এরপর ২০১৫ সালে তার ছেলে হেমন্তও ক্যান্সারের কারণে মারা যান। দুই সন্তান হারানোর পরেও আশা সঙ্গীতের প্রতি তার ভালোবাসা হারাননি। তার বোন লতা মঙ্গেশকরসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে সমর্থন জুগিয়েছিলেন। ২০২২ সালে লতা মঙ্গেশকরও মারা যান, এবং তারপর ২০২৬ সালে আশা ভোঁসলে নিজেও পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তার সঙ্গীতের তরী এখন তার ছোট ছেলে আনন্দ ভোঁসলের কন্যা জ়নাইয়ের হাতে পৌঁছে গেছে, যিনি আশার গানের ঐতিহ্য ধরে রাখবেন।






