সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন হাসিমুখে ধরা দিতেন তিনি। পোষ্য গরু ‘সুন্দরী’কে নিয়ে মজার ভিডিয়ো, মায়ের সঙ্গে খুনসুটি আর প্রাণখোলা কথাবার্তায় অল্প সময়েই হাজার হাজার মানুষের মন জয় করেছিলেন সায়নী চক্রবর্তী। কিন্তু সেই চেনা হাসির আড়ালেই কি লুকিয়ে ছিল গভীর মানসিক ক্লান্তি? ত্রিবেণীর গঙ্গার ঘাট থেকে জনপ্রিয় এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের নিথর দেহ উদ্ধারের পর থেকেই এমন প্রশ্ন ঘুরছে নেটদুনিয়ায়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাটি ঘিরে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হলেও এখনও রিপোর্ট হাতে আসেনি। ফলে মৃত্যুর আসল কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। পরিবারের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। তবে পুলিশ সবদিক খতিয়ে দেখে তদন্ত চালাচ্ছে। আর সেই তদন্তের মাঝেই নতুন করে সামনে আসছে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পারফেক্ট লাইফ’ দেখানোর সংস্কৃতি।
আইন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর সম্প্রতি নিজের সাফল্যের মুহূর্তও অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন সায়নী। এলএলবি পাশ করার খবর জানিয়ে পোস্ট করেছিলেন সমাজমাধ্যমে। মা মলি চক্রবর্তী এবং মেয়ে সায়নীর ভিডিয়ো ছিল বহু দর্শকের প্রতিদিনের বিনোদনের অংশ। বিশেষ করে তাঁদের পোষ্য ‘সুন্দরী’কে ঘিরে তৈরি ছোট ছোট মুহূর্ত মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যেত। মৃত্যুর আগের দিনও পেজে নতুন ভিডিয়ো আপলোড করা হয়েছিল। সেখানে আগের মতোই হাসিখুশি পরিবেশ দেখা গিয়েছে। আর এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যাঁকে প্রতিদিন এত আনন্দে দেখা যেত, তাঁর জীবনে এমন কী ঘটছিল যা বাইরে থেকে বোঝাই যায়নি? সোশ্যাল মিডিয়ায় সবসময় সুখী, সফল আর প্রাণবন্ত দেখানোর চাপ কি ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল তরুণীকে? অনেকের মতে, আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত কোনও একদিনের আবেগ থেকে আসে না, দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণাই মানুষকে সেই জায়গায় পৌঁছে দেয়।
সায়নীদের ভ্লগের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একেবারে ঘরোয়া জীবনযাপন। পোষ্যদের যত্ন, খাওয়াদাওয়া, মায়ের সঙ্গে মেয়ের সহজ সম্পর্ক, এসবই তাঁদের কনটেন্টকে আলাদা জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। অনুরাগীদের অনেকেই তাঁদের জন্য উপহার পাঠাতেন। কিন্তু সেই আনন্দঘন ফ্রেমের পিছনে ব্যক্তিগত জীবনে কোনও চাপ বা মানসিক অবসাদ কাজ করছিল কি না, তা নিয়েই এখন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন নিজেকে ‘পারফেক্ট’ প্রমাণ করার এক অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরই ব্যক্তিগত কষ্ট লুকিয়ে রেখে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে হাজির হন। কারণ ভিউস, জনপ্রিয়তা আর উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁদের ভবিষ্যৎ। সায়নীর মৃত্যুর পর সেই বাস্তবতা নিয়েই ফের প্রশ্ন উঠছে। নেটিজেনদের একাংশ বলছেন, সমাজমাধ্যমে যা দেখা যায়, বাস্তব জীবন তার থেকে অনেকটাই আলাদা হতে পারে।
এই ঘটনার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আরও একটি সাম্প্রতিক বিতর্ক। কয়েকদিন আগেই নৈহাটির বড়মার মন্দিরে গিয়ে চরম হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন সায়নী ও তাঁর মা। মন্দিরের ভিতর থেকেই ফেসবুক লাইভ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তাঁরা। ছবি তোলা এবং মন্দিরের অব্যবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বচসার ঘটনাও সামনে আসে। সেই লাইভ ভিডিয়ো ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। একাংশের দাবি ছিল, ভাইরাল হওয়ার জন্যই এমন কাজ করা হয়েছে। যদিও সায়নী এবং তাঁর মা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, নতুন করে ভাইরাল হওয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁদের নেই। কিন্তু সেই বিতর্কের রেশ কাটার আগেই ঘটে গেল এই মর্মান্তিক ঘটনা। ফলে অনেকেই মনে করছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত মানুষকে পরিচিতি দেয়, তেমনই সেই দুনিয়ার চাপ মানসিকভাবে ভেঙেও দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে রক্ষাকবচ দিল হাই কোর্ট! ভোট পরবর্তী উ’স্কানি মামলায় এখনই গ্রেফতারি বা কড়া পদক্ষেপ নয়, আপাতত স্বস্তি অভিনেতার!
সায়নীর মৃত্যু এখন শুধু একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সমাজমাধ্যমের বাস্তবতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রতিদিন যে হাসিমুখ, আনন্দ আর ইতিবাচকতার ছবি মানুষ দেখে, তার সবটাই কি সত্যি? নাকি ক্যামেরার ওপারে জমতে থাকে একাকীত্ব, হতাশা আর মানসিক ক্লান্তি? সায়নীর রহস্যমৃত্যুর পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা মিলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আপাতত তাঁর অনুরাগীরা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, যে তরুণী প্রতিদিন অন্যের মন ভালো রাখতেন, তিনি নিজেই এমন কঠিন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। ডিজিটাল দুনিয়ার চকচকে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক যন্ত্রণার দিকটাও তাই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।






