বাংলা সিনেমার পরিচিত পরিচালক অনীক দত্তর অকালপ্রয়াণ এখনও মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুরাগীরা। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত এই নির্মাতার মৃত্যু ঘিরে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখনই দীর্ঘ নীরবতার পর মুখ খুললেন তাঁর কাকা তথা প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার বিমল রায়ের পুত্র জয় বিমল রায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন ভাইপো অনীকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, শৈশবের স্মৃতি, একাকীত্বে ভরা শেষ দিনগুলি এবং মৃত্যুর আগে শেষ কয়েকটি কথোপকথনের কথা। পোস্টের শুরুতেই তিনি লেখেন, “আমার ভাইপো বুবা (অনীক দত্ত)-র বিষয়ে এতদিন কিছু লিখতে আমি দ্বিধাবোধ করছিলাম। কারণ ওঁর মৃত্যুটা একটা ‘মিডিয়া সার্কাস’-এ পরিণত হয়েছে।”
একইসঙ্গে তিনি জানান, কিছু বললেও ভুল বোঝার আশঙ্কা ছিল, আবার চুপ থাকলেও অনেকের কাছে তা উদাসীনতা বলে মনে হতে পারত। জয় বিমল রায় জানান, পরিবারের কাছে অনীক ছিলেন ‘বুবা’। তিনি ছিলেন বিমল রায়ের বড় দাদা অনিল রায়ের নাতি। অনিল রায় স্কটল্যান্ড থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করে ব্যারাকপুরের ‘এম্পায়ার জুট মিল’-এ চাকরি করতেন। সেই সময় মিল কম্পাউন্ডের বিশাল ফ্ল্যাটে পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। শৈশবের একটি মজার স্মৃতি মনে করে জয় লেখেন, “ওই মস্ত ফ্ল্যাটে বাথরুম ছিল মাত্র একটি।
স্বাভাবিকভাবেই সময় বাঁচাতে একদিন আমার খুড়তুতো ভাই পিপলু, বুবা আর আমাকে একসঙ্গে জোর করে ওই একটা বাথরুমে স্নান করার জন্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ব্যস! বুবা তো কান্নায় ভেঙে পড়ল। কোনও কিছুতেই ও আমাদের সাথে স্নান করতে রাজি হলো না।” তিনি আরও বলেন, এটাই ছিল অনীককে নিয়ে তাঁর জীবনের প্রথম স্মৃতি এবং সেটি আজও স্পষ্টভাবে মনে আছে। পরবর্তীতে বয়সের ব্যবধান ও আলাদা শহরে বড় হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সম্পর্ক অটুট ছিল। জয় জানান, অনীকের বাংলা ভাষার উপর অসাধারণ দখল ছিল এবং সেই দক্ষতাই ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর মতো ছবিকে বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
পরে হিন্দুস্তান পার্কে নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে ওঠার পর অনীকের জীবনেও নতুন অধ্যায় শুরু হয়। জয় স্মৃতিচারণ করে লেখেন, “ততদিনে বুবা চলচ্চিত্র জগতে এবং সমাজে এক বিশাল নামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে।” তিনি আরও লেখেন, “ওঁর ওই নতুন বাড়িটিই খুব দ্রুত আমাদের পারিবারিক আড্ডার সদর দফতর বা হেডকোয়ার্টার হয়ে উঠল।” সিনেমা, সাহিত্য, প্রেম, জীবন ও আত্মা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলত সেখানে। তাঁর কথায়, “ম্যাল্ট হুইস্কির সুগন্ধ আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ভরা ওই গভীর রাতের আড্ডাগুলোর মধ্যে একটা অন্যরকম আভিজাত্য ছিল।” পাশাপাশি অনীকের স্ত্রী সন্ধি দত্তর আন্তরিকতার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে অনীক সিওপিডি রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর জীবন হাসপাতাল ও বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। জয় জানান, ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল তিনি শেষবার অনীকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, “রাত তখন পৌনে ন’টা। পরিচারিকা দরজাটা সামান্য ফাঁক করে এক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত চূড়ান্ত সুরে বলল, ‘দাদা ঘুমাচ্ছেন’।” কিন্তু তিনি ভেতরে ঢুকে দেখেন, আধো অন্ধকার ঘরে অনীক বাই-প্যাপ মেশিন ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জয় একটি হুইস্কির বোতল নিয়ে গেলে অনীক জিজ্ঞেস করেন, “এটা কি আমার জন্য? ডাক্তার তো আমাকে খেতে বারণ করেছেন।”
সেই কথোপকথনের মাঝেই অনীকের একাকীত্ব তাঁকে নাড়া দেয়। তিনি লেখেন, “ওঁর একাকীত্বটা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে আমার মনটা কেঁদে উঠেছিল।” এরপর অনীক জানান, “আমার স্কুলের বন্ধুরা মাঝে মাঝে আসে।” কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করেন, “আমাকে কেমন দেখতে লাগছে?” জয় স্বীকার করেন, বাস্তবে অনীককে খুবই দুর্বল ও অসুস্থ লাগছিল, কিন্তু তাঁকে কষ্ট না দিতে তিনি বলেছিলেন সব ঠিক আছে। পরে যখন তিনি জানতে চান নতুন কিছু লিখছেন কি না, অনীক বিষণ্ণভাবে বলেন, “আমি কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছি না।” জয় বিমল রায় আরও জানান, মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও অনীক তাঁকে ফোন করেছিলেন। যদিও তখন তাঁর গলার স্বর কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছিল, তবুও তিনি নিজের পছন্দের এক তরুণী অভিনেত্রীকে জয় যেন নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান, সেই অনুরোধ করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ কণ্ঠ ছিল স্বর্গীয়, তবু আজীবন বঞ্চ’নার শি কার! যে গান শুনে সবাই ভাবতেন লতা মঙ্গেশকর, সেই কণ্ঠের মালিকই রয়ে গেলেন আড়ালে! কেন সুমন কল্যাণপুরকে বলা হয় ‘অদৃশ্য কিংবদন্তি’? গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন সঙ্গীতশিল্পী, জানুন তাঁর বেদনাভরা জীবন ও না-পাওয়ার দীর্ঘ গল্প!
পাশাপাশি নতুন একটি কাজ শুরু করার কথাও জানিয়েছিলেন অনীক। এতে জয় আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আসে দুঃসংবাদ। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন, “গত ২৭ মে দুপুর ২টো নাগাদ কলকাতার এক ভাইঝির ফোন এল। ও বলল, ‘একটা খুব খারাপ খবর আছে, অনীকদা আর নেই’।” প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি কার কথা বলা হচ্ছে। পরে যখন শুনলেন “বুবা”, তখন যেন সবকিছু বদলে যায়। পোস্টের শেষে তাঁর আবেগঘন স্বীকারোক্তি, “মুহূর্তের মধ্যে আমার চেনা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। আর সেই ওলটপালট হয়ে যাওয়া দুনিয়াটা এখনও আর সোজা হতে পারল না।”






