আজ যখন শুভ্রজিৎ সাহার পা ভাঙার পর ধারাবাহিক ‘শুধু তোমারই জন্য’ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে দর্শকমহলে আলোচনা চলছে, তখন না বললেই নয় সেই লড়াকু অভিনেত্রীর কথা। তিনি ‘রীতা দত্ত চক্রবর্তী’ (Rita Dutta Chakraborty)। জীবনের ভয়াবহ শারীরিক সংকটের মধ্যেও যিনি অভিনয় ছাড়েননি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শুভ্রজিতের ধারাবাহিক যেমন এসভিএফ প্রোডাকশনের, তেমনই রীতার সেই সময়কার ধারাবাহিকটি ছিল একই প্রযোজনা সংস্থার ছিল। তবে রীতা বরাবরই জানিয়েছেন, কঠিন সময়ে প্রযোজনা সংস্থার পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। তাই অভিনেত্রীর গল্পটি শুনলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, শুভ্রজিতের ধারাবাহিক ছাড়ার পেছনে রয়েছে অন্য কোনও কারণ।
অভিনয়ের সঙ্গে রীতা দত্ত চক্রবর্তীর সম্পর্ক শুরু বেশ অল্প বয়সে। কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব তৃপ্তি মিত্রের কাছে অভিনয়ের পাঠ নিয়েছিলেন তিনি। যদিও প্রথম জীবনে কখনও ভাবেননি অভিনয়কেই নিজের পেশা বানাবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অভিনয় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বছর খানেক আগে এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী নিজের জীবনের এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, যা এতদিন খুব কম মানুষই জানতেন। বিশেষ করে তাঁর ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং সেই পরিস্থিতিতেও অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প নতুন করে চর্চায় এসেছে।

দুর্ঘটনার কথা বলতে গিয়ে রীতা বলেন, “আমার বা পায়ের গোড়ালি ভেঙে গিয়ে পুরো ঝুলে পড়েছিল, চার পাশ থেকে চারটে হাড় বেরিয়ে এসেছিল।” সেই সময় তিনি ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘গৌরিদান’-এ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রযোজকদের সবকিছু জানান। অভিনেত্রীর কথায়, “ওনারা বলেছিলেন, ‘তোমাকেই করতে হবে চরিত্রটা, অন্য কেউকে ভাবতেই পারছি না।’ এদিকে চিকিৎসকরা আমায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।”
দুর্ঘটনার পরে রীতার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে উঠেছিল। তাঁর পায়ে দশটি স্ক্রু এবং তিনটি ধাতব পাত বসাতে হয়েছিল। চিকিৎসকদের নির্দেশ ছিল সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে এবং পা সবসময় সোজা রাখতে হবে। কোনওরকম নড়াচড়া করা যাবে না বলেও জানানো হয়েছিল। রীতা বলেন, “ডাক্তার বলেছিলেন পা ঠিক হবে কিনা কোনও গ্যারান্টি নেই। যদি হয়ও সেটা ঈশ্বরের দয়াতে। নচেৎ আমার আর হাঁটা হবে না।” এমন পরিস্থিতিতে পরেও তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের মনে দৃঢ় বিশ্বাস রেখেছিলেন যে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন।
অস্ত্রোপচারের মাত্র ছয় দিন পরই ফের শুটিং করার সিদ্ধান্ত নেন অভিনেত্রী। প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কথা বলে সবটা ঠিকও করে নেন। প্রতিদিন সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে বাড়ি থেকে শুটিং ফ্লোরে নিয়ে যাওয়া হতো। অভিনেত্রীর কথায়, নিচে এসে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকত এবং স্ট্রেচারে করে তাকে দোতলা থেকে সেখানে আনা হতো। সেটে তাঁর জন্য হুইলচেয়ার রাখা হয়েছিল, যাতে পা সোজা রেখেই অভিনয় করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে রীতা বলেন, “আমি চরিত্রটার জন্য হুইলচেয়ার চালানো শিখে নিই। ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। ওরাই আমাকে সেই সাহসটা দিয়েছিল। ওরা না থাকলে হয়তো আমার পক্ষেও এটা সম্ভব হত না।”

আরও পড়ুনঃ “ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়!” রুবেলের দুই পা প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল, তবুও বাড়িতে বসেই ‘নিম ফুলের মধু’র শুটিং চালিয়ে গেছেন! শুভ্রজিতের ক্ষেত্রেও অন্য রাস্তা ছিল না, নাকি রয়েছে বউয়ের বারণ? ‘শুধু তোমারই জন্য’র নায়ক সরে দাঁড়াতেই, দু’জনের পরিস্থিতি তুলনা করে সরব দর্শকমহল!
তাঁর মতে, সেই সময় প্রযোজনা সংস্থার সহযোগিতাই তাঁকে নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি জুগিয়েছিল। আজও সেই সময়ের কথা মনে করলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, তখন খুব কষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন মনে হয়, যদি সেই সময় শুধু বিছানায় পড়ে থাকলে, জীবন কীভাবে লড়াই করে বাঁচতে শেখায়, সেটা বুঝতেন না। অভিনয় তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, জীবনের শক্তি বলেও জানান তিনি। নিজের সাফল্যের চেয়ে লড়াইকে আড়ালেই রাখতে পছন্দ করতেন অভিনেত্রী, তাই এই গল্প খুব কম মানুষই জানেন।






