বাংলা চলচ্চিত্র জগতে বহু তারকা এসেছেন, জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছেন, আবার সময়ের স্রোতে অনেকেই ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অভিনয়, অবদান এবং সংগ্রামের গল্প আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এমনই এক শিল্পী ছিলেন পদ্মা দেবী। ব্যক্তিগত জীবনকে সবসময় প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখতে পছন্দ করলেও তাঁর অভিনয়জীবন ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বৈচিত্র্যময়। নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছেন। অথচ বাংলা সিনেমার এই গুরুত্বপূর্ণ অভিনেত্রীকে নিয়ে আজও সাধারণ দর্শকের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই।
পদ্মা দেবীর অভিনয়জীবনের শুরু নিয়ে চলচ্চিত্র ইতিহাসে কিছু মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, ১৯৩৯ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা-পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়ার হাত ধরেই তাঁর বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ। সে সময় নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে মুভিটোনে যোগ দিয়েছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া এবং তাঁর পরিচালিত ‘সাপমুক্তি’ ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন পদ্মা দেবী। ছবিতে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন জনপ্রিয় গায়ক-অভিনেতা রবীন মজুমদার। তবে অন্য একটি মত অনুযায়ী, পরিচালক প্রফুল্ল রায়ের ১৯৩৪ সালের ‘চাঁদ সওদাগর’ ছবিই ছিল তাঁর প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র। যাই হোক, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এবং নিজের অভিনয় দক্ষতার জন্য দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেন।
ক্যারিয়ারের প্রথমদিকে নায়িকা চরিত্রে সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করলেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন পদ্মা দেবী। বাংলা ও হিন্দি দুই ভাষার ছবিতেই তিনি সমান সাবলীল ছিলেন। মধু বসু, দেবকীকুমার বসু, নরেন্দ্র মিত্র, নীতিন বসু, নির্মল দে, সুকুমার দাশগুপ্ত, নিরেন লাহিড়ী, বিমল রায়, তপন সিংহ, সত্যজিৎ রায়, শক্তি সামন্ত, তরুণ মজুমদারসহ একাধিক খ্যাতনামা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সহ-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রাভিনেত্রী সব ধরনের ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বড় চরিত্র হোক কিংবা ছোট, পর্দায় তাঁর উপস্থিতি সবসময় দর্শকের নজর কেড়ে নিত।
বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের এক নীরব সাক্ষী ছিলেন পদ্মা দেবী। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’, তপন সিংহের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, অজয় করের ‘সপ্তপদী’ কিংবা তরুণ মজুমদারের ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এর মতো উল্লেখযোগ্য ছবিতে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে স্মরণীয়। এছাড়াও ‘বাঙালি’, ‘মেয়ে’, ‘জননী’, ‘দেবী’, ‘জীবনসঙ্গিনী’, ‘মহাকবি কালিদাস’, ‘পাপের পথে’, ‘ওগো শুনছো’, ‘ভগবান শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ’, ‘চোরাবালি’, ‘গৃহলক্ষ্মী’, ‘মাটির ঘর’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘বিষকন্যা’, ‘দেড়শো খোকার কাণ্ড’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘জয় মা তারা’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘অদ্বিতীয়া’ এবং ‘ছদ্মবেশী’-সহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রভাণ্ডার।
আরও পড়ুনঃ ‘দেশ হারাল একজন ভবিষ্যতের দেশ প্রেমিকাকে, গভীর শো’কের বিষয়ে আমাদের দেশের পক্ষে!’ মানুষের সেবা করার শখ মিটে গেল? তৃণমূলে যোগের দু’মাসেই রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা, আমেরিকা যাওয়ার ছবি পোস্ট করতেই কটা’ক্ষের মুখে কোয়েল মল্লিক!
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন পদ্মা দেবী। বদলে যাওয়া সময়, নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের আগমন কিংবা চলচ্চিত্রের রুচির পরিবর্তন কোনও কিছুই তাঁকে শিল্পচর্চা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৮৩ সালের ৩১ জানুয়ারি এই বরেণ্য অভিনেত্রীর জীবনাবসান হয়। তবে তাঁর প্রয়াণে থেমে যায়নি তাঁর স্মৃতি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পদ্মা দেবী আজও এক উজ্জ্বল নাম, যাঁর অভিনয়, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘ কর্মজীবন নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।






