মাত্র ২০০ টাকা ধার নিয়ে চোখে জল আটকে রাখতে পারেননি উত্তমকুমার! সেদিন সুব্রতা চ্যাটার্জীর কোন একটি কথায় প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন স্বয়ং মহানায়ক? জানেন, কী এমন ঘটেছিল যে ধার নেওয়া সেই টাকা কোনওদিন ফেরত দিতে পারেননি তিনি?

বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোয় দর্শকরা সাধারণত তারকাদের অভিনয়, সাফল্য কিংবা জনপ্রিয়তার গল্পই দেখে থাকেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন, আবেগ আর মানবিকতার অসংখ্য অজানা কাহিনি থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। একই পরিবারের সদস্য হওয়া, সহকর্মী হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটানো কিংবা জীবনের কঠিন মুহূর্তে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মতো ঘটনাগুলি অনেক সময় তারকাদের প্রকৃত মানুষটিকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলা চলচ্চিত্র জগতেও এমন বহু সম্পর্কের গল্প রয়েছে, যা আজও ভক্তদের আবেগতাড়িত করে। তেমনই এক স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছিলেন অভিনেত্রী সুব্রতা চ্যাটার্জী, যেখানে উঠে এসেছে মহানায়ক উত্তমকুমারের এক অন্যরকম মানবিক মুখ।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তমকুমার শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক যুগের নাম। কোটি বাঙালির হৃদয়ে আজও তিনি মহানায়ক হিসেবেই অমর। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দার উপস্থিতি তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে। তবে পর্দার বাইরের উত্তমকুমারও ছিলেন সমানভাবে সংবেদনশীল, পরিবারমুখী এবং আবেগপ্রবণ মানুষ। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় বারবার উঠে এসেছে সেই মানুষটির কথা, যিনি খ্যাতির শিখরে থেকেও আপনজনদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধে কখনও পিছিয়ে পড়েননি। সুব্রতা চ্যাটার্জীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে প্রথমবার উত্তমকুমারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তাঁর।

তার কিছুদিন আগেই তরুণকুমারের সঙ্গে সুব্রতার রেজিস্ট্রি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, যদিও সেই খবর তখনও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। এমন সময় গ্র্যান্ড হোটেলের প্রিন্সেস রেস্তোরাঁয় দেখা করার জন্য ডাক আসে। সুব্রতা সেখানে পৌঁছন তরুণকুমারকে নিয়ে, আর উত্তমকুমার আসেন তাঁর স্ত্রী গৌরী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানেই প্রথম ঘনিষ্ঠ আলাপ। কথোপকথনের এক পর্যায়ে উত্তমকুমার স্নেহভরে সুব্রতাকে বলেন, তিনি তাঁদের বিয়ের কথা শুনেছেন এবং তাঁদের পরিবার অত্যন্ত রক্ষণশীল, তাই সেখানে মানিয়ে নিতে কোনও অসুবিধা হবে কি না, সে বিষয়েও জানতে চান। কিন্তু তখন সুব্রতার মন ছিল অন্য জায়গায়।

ছোটবেলা থেকেই যাঁর অভিনয়ের ভক্ত ছিলেন, সেই মহানায়ককে সামনে পেয়ে তিনি যেন মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়েই ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে সুব্রতা ও তরুণকুমারের বিয়ে হয়। সেই বিয়েতেও বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন উত্তমকুমার। জানা যায়, নিজের হাতে সুব্রতার বসার জন্য বিশেষ থ্রোন সাজিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁদের সম্পর্কের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়টি আসে একটি সামান্য ২০০ টাকাকে ঘিরে। গৌরী দেবীর বাবার মৃত্যুর পর একদিন গভীর রাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে উত্তমকুমার সোজা তরুণকুমারের কাছে এসে কিছু অর্থ ধার চান। সেই মুহূর্তে তরুণকুমারের কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না।

আরও পড়ুনঃ ২০ দিনে শারী’রিক অবস্থার আরও অব’নতি সোনু নিগমের! মাথা ঘোরানো তো দূরের কথা, কাঁধও নাড়াতেও অ’ক্ষম! নিজের পায়ে ঠিকমতো দাঁড়াতেও ক’ষ্ট! কোন রো’গে কাবু হয়েছেন গায়ক? আর কি কখনও গান গাইতে পারবেন না তিনি?

তখন সুব্রতা নিজেই এগিয়ে এসে ২০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং সেই অর্থ উত্তমকুমারকে ধার দেন। কিছুদিন পরে উত্তমকুমার সেই টাকা ফেরত দিতে এলে সুব্রতা মজার ছলে বলেন, “বেশ, আমার টাকাটা ফেরত দিন। তারপর আমিও রোজগার করে আপনার সব ঋণ শোধ করে দেব।” এরপর তিনি আরও বলেন, “দাদা হয়ে আপনি যদি বোনের টাকা ফেরত দেন, তাহলে আমি বোন হয়ে কেন দেব না?” এই কথাগুলি শুনে নাকি আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন মহানায়ক। তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে কেঁদে ফেলেছিলেন সুব্রতাও। শেষ পর্যন্ত আর সেই ২০০ টাকা ফেরত নেওয়া হয়নি। অর্থের অঙ্কে সামান্য হলেও এই ঘটনার মূল্য ছিল অমূল্য কারণ সেখানে ছিল ভাই-বোনের মতো এক গভীর সম্পর্ক, আন্তরিকতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্পর্শ। মহানায়ক উত্তমকুমারের জীবনের এই ছোট্ট অধ্যায় আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য মানবিক স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।

You cannot copy content of this page