“টলিউডে কয়টা শাহরুখ খান আছে যে নিপোটিজম করে বেড়াচ্ছে? এই শব্দটা বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে খাটে না, বরং বলা ভালো ওটা ফেভারিটিজম বা গ্রুপিজম!” ১০ থেকে ১৫ জনকে নিয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হচ্ছে সব! টলিউডে মেধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কী? ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল নিয়ে মুখ খুললেন দেবযানী চট্টোপাধ্যায়! প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে কী বললেন?

বাংলা অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ অভিনেত্রী দেবযানী চট্টোপাধ্যায় (Debjani Chatterjee)। থিয়েটারের মঞ্চ থেকেই তাঁর অভিনয় জীবনের শুরু। এরপর একাধিক বাংলা ধারাবাহিক, সিনেমা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। বরাবরই চরিত্রের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। জনপ্রিয়তার জন্য নয়, বরং অভিনয়ের সুযোগ এবং চরিত্রের গভীরতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের কর্মজীবন, দীর্ঘদিন টেলিভিশন থেকে দূরে থাকার কারণ এবং বর্তমান বাংলা বিনোদন জগতের নানান বাস্তব চিত্র নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সেই সাক্ষাৎকারের একাধিক মন্তব্য ইতিমধ্যেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সাক্ষাৎকারে দেবযানী স্পষ্ট জানিয়েছেন, টেলিভিশন থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজের। কোনও বাধ্যবাধকতার কারণে নয়, বরং একঘেয়েমি অনুভব করায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, একই ধরনের চরিত্র বারবার করতে করতে অভিনয়ের আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছিল। তাই তিনি কিছুটা বিরতি নিয়ে নতুন ধরনের কাজের অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি নতুন সুযোগের খোঁজে মুম্বইয়ে নিয়মিত অডিশন দিচ্ছেন। নতুন পরিবেশে আবারও নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তিনি প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, একজন শিল্পীর শেখার এবং নতুনভাবে শুরু করার কোনও নির্দিষ্ট বয়স হয় না।

তবে সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল টলিউড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাঁর মন্তব্য। দেবযানীর দাবি, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এখন মেধার পাশাপাশি আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, আর সেটি হল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের গোষ্ঠী। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন শিল্পীকে ঘিরেই বারবার কাজ হচ্ছে। পরিচালকদের বড় একটি অংশ ওই পরিচিত মুখগুলোকেই নিয়ে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ফলে বহু অভিজ্ঞ এবং দক্ষ শিল্পী সুযোগ পাওয়ার আগেই পিছিয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি কোনও সুস্থ শিল্প জগতের লক্ষণ হতে পারে না বলেই মনে করেন তিনি।

দেবযানী আরও বলেন, অনেকেই এই বিষয়টিকে স্বজনপোষণ বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু তাঁর মতে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে সমস্যাটি অন্য জায়গায়। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এখানে বলিউডের মতো স্বজনপোষণের চেয়ে বেশি দেখা যায় প্রিয়পাত্র বেছে নেওয়ার প্রবণতা এবং গোষ্ঠীতন্ত্র। অর্থাৎ, কিছু পরিচালক বা প্রযোজক নির্দিষ্ট কিছু শিল্পীকেই বারবার সুযোগ দিতে চান। ফলে সেই নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে থাকা শিল্পীদের সামনে সুযোগের দরজা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সময় কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিচ্ছে।

অভিনেত্রীর কথায়, এক সময় তিনি নিজেও এসব বিষয় বিশ্বাস করতেন না। মনে করতেন, ভালো কাজ করলে সুযোগ একদিন না একদিন আসবেই। কিন্তু গত কয়েক বছরে কাজের সূত্রে কলকাতায় এসে তিনি ভিন্ন বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছেন। তখনই তাঁর কাছে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও যদি একজন শিল্পী শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ না হওয়ার কারণে কাজ না পান, তাহলে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক বলে মনে করেন তিনি। একজন পেশাদার শিল্পীর মূল্যায়ন তাঁর কাজের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে নয় বলেও মন্তব্য করেন দেবযানী।

সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক তথাকথিত ‘বয়কট সংস্কৃতি’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিনেত্রী। বিশেষ করে রাহুলের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানতে চান, এমন কঠিন সময়ে শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে আর্টিস্ট ফোরামের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল। তাঁর মতে, কোনও শিল্পীর বিপদের সময় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নয়, বাস্তব সাহায্য এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইন্ডাস্ট্রির সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে শিল্পীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে এত আক্ষেপের মধ্যেও দেবযানী চট্টোপাধ্যায় আশাবাদী।

আরও পড়ুনঃ “খুব কষ্ট করে বড় হয়েছি, কিন্তু সঠিক শাসনটা পেয়েছিলাম বলেই অমানুষ হইনি” “ক্ষমতা থাকলেও সঠিক শাসন করতে পারেন ক’জন?” বড় মন্তব্য অঞ্জনা বসুর! সন্তানকে ‘যা খুশি তাই করো’ বলা আধুনিক অভিভাবকরা কি মানুষ গড়ছে, নাকি ভেঙে দিচ্ছে শিরদাঁড়া? অভিনেত্রীর প্রশ্নের মুখে বর্তমান প্রজন্মের সন্তান মানুষ করার পদ্ধতি! সত্যিই কি শাসন আর কঠোর নিয়মের মধ্যেই তৈরি হয় সঠিক মূল্যবোধ?

তিনি জানান, ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি বা ব্যক্তিগত সমীকরণ নিয়ে সময় নষ্ট করতে চান না। বরং নিজের পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। নতুন সুযোগের জন্য তিনি এখনও সমান উৎসাহ নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, মেধা এবং পরিশ্রমের মূল্য একদিন না একদিন অবশ্যই মিলবে। একই সঙ্গে তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে বাংলা বিনোদন জগতেও এমন পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে শিল্পীদের মূল্যায়ন হবে তাঁদের কাজ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে, কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার ভিত্তিতে নয়।

You cannot copy content of this page