বিনোদন জগতের বহু শিল্পীর জীবন ঘিরে এমন অনেক গল্প থাকে, যা সাধারণ দর্শকের কাছে কখনও পৌঁছয় না। পর্দায় তাঁদের কাজ, সাফল্য কিংবা ব্যক্তিজীবনের কিছু ঘটনা নিয়ে আলোচনা হলেও কাছের মানুষদের স্মৃতিতে লুকিয়ে থাকা বহু অজানা অধ্যায় অজানাই থেকে যায়। বিশেষ করে কোনও শিল্পী প্রয়াত হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে থাকা মানুষদের স্মৃতিচারণেই সামনে আসে সেই না-জানা গল্প। তেমনই এক স্মৃতিচারণে উঠে এল বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি কিশোর কুমারকে ঘিরে একাধিক অজানা কথা। শুধু কিশোর কুমার নন, তাঁর সঙ্গে যুক্ত রুমা গুহঠাকুরতা, সত্যজিৎ রায় এবং গুহঠাকুরতা পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নানা কথাও উঠে এসেছে।
কিশোর কুমার ছিলেন ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী। গায়ক, অভিনেতা এবং বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা আজও অটুট। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী ও গায়িকা রুমা গুহঠাকুরতা। তাঁদের সন্তান অমিত কুমারও পরবর্তীকালে বাবার পথ অনুসরণ করে সংগীতজগতে পরিচিতি তৈরি করেন। রুমা গুহঠাকুরতার মেয়ে শ্রমণা গুহঠাকুরতা আবার একদিকে কিশোর কুমারের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে সত্যজিৎ রায় ও গুহঠাকুরতা পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেরও অংশ। নিবেদিতা অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, পরিবার এবং কিশোর কুমারের সঙ্গে সম্পর্কের নানা স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন শ্রমণা। তাঁর কথায়, ছোটবেলা থেকেই তিনি কিশোর কুমারকে ‘বাপি’ বলে ডাকতেন এবং তাঁর কাছে যাতায়াত ছিল নিয়মিত।
কিশোর কুমারকে স্মরণ করতে গিয়ে শ্রমণা জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর সঙ্গে খুব কাছের সম্পর্ক ছিল। কিশোর কুমার যখন কলকাতায় আসতেন, হোটেলে থাকলেও শ্রমণা তাঁর কাছে গিয়ে থাকতেন এবং নানা বিষয় নিয়ে সময় কাটাতেন। কিশোরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন ‘মদনদা’ নামে এক ব্যক্তি, যাঁকে শ্রমণার মা কলকাতা থেকে পাঠিয়েছিলেন। কারণ কিশোর কুমার বাঙালি খাবার অত্যন্ত পছন্দ করতেন। শ্রমণার স্মৃতিতে, ডাল, আলুভাজা, মাছভাজা থেকে শুরু করে জিলিপি ও দই বাঙালি খাবারের প্রতি তাঁর আলাদা টান ছিল। কিশোর কুমারের ব্যক্তিত্ব নিয়েও তাঁর স্মৃতি বেশ আলাদা। বাইরে থেকে যাঁকে দুষ্টুমি ও মজার মানুষ হিসেবে দেখা যেত, পরিবারের কাছে তাঁর অন্য একটি রূপ ছিল বলে জানান শ্রমণা।
তিনি বই পড়তে, গান শুনতে এবং পরিবারের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। এমনকি ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে শুটিংয়ে গেলে কিশোর তাঁকে গরমের মধ্যে শুটিংয়ে না রেখে নিজের কাছে রাখার কথাও বলেছিলেন বলে জানান শ্রমণা। কিশোর কুমারের সঙ্গে রুমা গুহঠাকুরতার বিচ্ছেদ এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর মধুবালাকে বিয়ে করা নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন ওঠে। তবে এর সঠিক কারণ তিনি জানেন না বলেই স্পষ্ট করেন শ্রমণা। পরিবারের কেউ তাঁকে এই বিষয়ে কখনও বিস্তারিতভাবে কিছু বলেননি। কিশোর কুমার ও মধুবালার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গল্প শুনলেও তিনি সেগুলিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে মানতে চাননি। বরং মধুবালার সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে শ্রমণা বলেন, এত সুন্দর একজন মহিলার প্রেমে পড়লে দোষের কিছু দেখেন না তিনি। তাঁর মতে, মধুবালার জীবনের শেষপর্বে কিশোর কুমারের সঙ্গ ও যত্নও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে, কিশোর কুমারের অসুস্থতার সময় তাঁর মা রুমার সঙ্গে মধুবালার ঘনিষ্ঠতার কথাও জানান শ্রমণা। কিশোর কুমারের হার্ট অ্যাটাকের পর মধুবালা কলকাতায় এসে রুমার পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এবং সেই সময় তাঁদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। শ্রমণার কথায়, মধুবালা তাঁর মাকে ‘মামনি’ বলে ডাকতেন এবং তাঁকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। এই সম্পর্ককে তিনি অত্যন্ত বিরল ও সুন্দর বলেই মনে করেন। শুধু কিশোর কুমার নয়, নিজের শৈশব ও পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশের কথাও উঠে এসেছে শ্রমণার স্মৃতিচারণে। ছোটবেলায় দুর্গাবাড়ির পুজো, পাড়ার মানুষদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, মিষ্টির দোকান থেকে গরম রসগোল্লা খাওয়া কিংবা বারান্দায় পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা সব মিলিয়ে তাঁর শৈশব ছিল একেবারেই অন্যরকম। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই তিনি মঞ্চে গান গাইতেন।
আরও পড়ুনঃ “আমি ভালো নে’ই, স্ত্রী ও সন্তান…” কয়েকদিন আগেই তরুণ কুমারের কাছে কেঁ’দে কেঁ’দে এই কথাই বলেছিলেন মহানায়ক! মৃ’ত্যুর পর কেন পু’ড়িয়ে ফেলা হয়েছিল তাঁর লাল ডায়েরি? উত্তম কুমারের জীবনের নানান অজানা রহস্য উন্মোচন করেছিলেন তাঁর ছোট ভাই? কী কী এমন লিখে গিয়েছিলেন দাদা?
পরে রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদের গান শেখার পাশাপাশি গানকে পেশা হিসেবেও দেখেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখা প্রশাখা’ ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। কিশোর কুমারের গান নিয়ে তাঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। ‘জিন্দেগি কে সফর মে’ গানটি গাওয়ার পর টাইমস মিউজিকের হয়ে কিশোর কুমারের ১২টি হিন্দি গান রেকর্ড করেছিলেন শ্রমণা। তবে এত কিংবদন্তির পরিবারে বড় হলেও তাঁদের কখনও ‘সেলিব্রিটি’ হিসেবে দেখেননি তিনি। তাঁর কথায়, বাড়ির মানুষদের কাছে তাঁরা ছিলেন শুধুই বাবা, কাকা, মাসি কিংবা দাদু। সেই কারণেই হয়তো কিশোর কুমার, রুমা গুহঠাকুরতা ও সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাটানো তাঁর স্মৃতিগুলো এতটাই স্বাভাবিক, অথচ এত মূল্যবান।






