“এমএলএ, এমপিরা ভেবেই নেন সারাজীবন তিনিই রাজা থাকবেন আর প্রজাদের উপর মিথ্যাচার চালাবেন…” “আমরা কি স্বাধীনতার সবটা পেয়েছি? স্বাধীন হলে এগুলো কেন হচ্ছে?” ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে মুখ খুললেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়! বর্ষীয়ান অভিনেতার কেন মনে হয়, আমরা আজও অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত?

৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিজের শৈশবের স্মৃতি এবং স্বাধীনতা নিয়ে উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, ১৯৪৪ সালে তাঁদের পরিবার কলকাতায় আসে। তখন তিনি একেবারেই ছোট, দমদম এলাকায় তাঁদের বাস ছিল। সেই সময়েই তিনি দেখেছিলেন ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ ঘিরে উত্তেজনা এবং বড়দের ব্যস্ততা। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় স্বাধীনতার অর্থ বোঝার মতো বয়স তাঁর হয়নি। পরে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশের জন্য মানুষের আত্মত্যাগ এবং সেই সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। তাঁর স্মৃতিতে স্বাধীনতা দিবস মানেই ছিল স্থানীয় জিমন্যাস্টিক ক্লাবে সাদা পোশাক পরে যাওয়া, ব্যান্ডের সুর এবং দেশাত্মবোধক গান।

শৈশবের সেই স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন ছিল খুবই সাধারণ। বড়রা ড্রাম বাজাতেন, বাঁশিতে বাজত ‘চল চল চল’ গানের সুর। ভারতের তেরঙা পতাকা উত্তোলন করা হত এবং রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হত ক্লাবের জায়গা। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি রাখা হত, তাঁদের ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হত। ছোটদের হাতে দেওয়া হত লজেন্স ও বিস্কুট। এর বাইরে বড় কোনও আয়োজন ছিল না বলেই জানান অভিনেতা। তখন অবশ্য দেশের স্বাধীনতার গভীর অর্থ বোঝার মতো বয়স তাঁর ছিল না। ধীরে ধীরে কৈশোরে পৌঁছনোর পর ইতিহাসের নানা অধ্যায় তাঁর সামনে খুলতে থাকে। জানতে পারেন, কীভাবে ব্যবসা করতে এসে ইংরেজরা ধীরে ধীরে শাসকের ভূমিকা নিয়েছিল এবং দেশের উপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

পরিণত বয়সে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামের আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বিপ্লব এবং দেশের জন্য অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মহাত্মা গান্ধীর অবদান এবং তাঁর হত্যার ঘটনাও পরবর্তীকালে জানতে পারেন তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার অর্থ নিয়েও তাঁর ভাবনা বদলেছে। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী, এই প্রশ্নগুলি তাঁকে ভাবিয়েছে। তাঁর কথায়, “এখন মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? স্বাধীন হলে এগুলো কেন হচ্ছে?” দেশের চারপাশের পরিস্থিতি দেখে তাঁর মনে হয়েছে, স্বাধীনতার সবটুকু হয়তো এখনও পাওয়া যায়নি। অন্য স্বাধীন দেশগুলিতে যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য থাকার কথা, সেই জায়গায় এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কোথাও যেন পিছিয়ে থাকার অনুভূতি রয়েছে। তাঁর কথায়, নিজের দেশেই অনেক সময় মানুষকে পরাধীনতার মতো পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয় বলে মনে হয়। শৈশবে স্বাধীনতা দিবসের যে শান্ত ও আনন্দের ছবি দেখেছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতিই অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, দেশের কোথাও না কোথাও অশান্তি লেগেই রয়েছে এবং মানুষ সবসময় নিজের পছন্দের পরিবেশ পাচ্ছেন না। জনপ্রতিনিধিদের প্রসঙ্গেও নিজের মত জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, মানুষ ভোট দিয়ে এমএলএ, এমপি নির্বাচন করেন এবং আশা করেন তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই নিজেদের দীর্ঘদিনের শাসক হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। সেখান থেকেই লোভ, মিথ্যাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো সমস্যা তৈরি হয়।

গণতন্ত্র ও সংবিধান থাকার পরেও ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা নিয়ম না মানলে সাধারণ মানুষের সমালোচনা করার অধিকার থাকবেই বলে মনে করেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, দেশের দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু করা নয়, বরং মানুষের দেওয়া দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা। অনেক সাধারণ মানুষ আবার সমস্যায় পড়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে পারেন না। অভিনেতার মতে, এটিও এক ধরনের স্বাধীনতা হারানোর পরিস্থিতি। তাঁর বক্তব্য, ক্ষমতা মানুষের সেবার জন্য দেওয়া হলেও তার অপব্যবহার এখনও হচ্ছে। অনেকেই অপছন্দের বিষয় মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যদিও কেউ কেউ প্রতিবাদও করছেন। স্বাধীনতা দিবস পালনের ধরন নিয়েও তাঁর আক্ষেপ রয়েছে। তাঁর মতে, এখন অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবের সঙ্গে স্বার্থ এবং রাজনীতি জড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি নিজে খারাপ নয়, কিন্তু তার অপব্যবহারই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুনঃ “ওঁর ফুসফুস আর কাজ করছে না, চিকিৎসকেরা বলছেন…” গত সাত বছর ধরেই হাঁটতে সমস্যা, বছরের শুরুতেই হয় শিরদাঁড়ায় অ’স্ত্রোপচার! পুরনো চো’ট থেকে একের পর এক জটিলতা, এবার ফুসফুস বিকল হয়ে ভেন্টিলেশনে রাজা সেন! বর্ষীয়ান পরিচালকের শারীরিক অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে আবেগপ্রবণ স্ত্রী পাপিয়া সেন!

শেষ পর্যন্ত পরান বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নের কথা বলেছেন, যেখানে মানুষ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ এবং স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাতে পারবেন। তাঁর মতে, একটি স্বাধীন দেশে এমন পরিবেশ থাকা উচিত যেখানে মানুষ ভয় ছাড়াই নিঃশ্বাস নিতে পারবেন, হাসিমুখে কথা বলতে পারবেন এবং একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারবেন। সেখানে জাতি বা ধর্মের বিভাজনের বদলে মানবিকতা এবং মনুষ্যত্বই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। সবাই একসঙ্গে উৎসবে অংশ নেবেন এবং সমাজে এমন সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে আলাদা করে কাউকে বোঝাতে হবে না যে তাঁরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তিনি পুরোপুরি আশাহীন নন। বরং তাঁর কথায়, “তবু এখনও মনে হয়, একটু অপেক্ষা করি। দেখা যাক কী হয়।” স্বাধীনতার ৮০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে তাঁর এই ভাবনা তাই একদিকে যেমন অতীতের স্মৃতিকে সামনে আনে, তেমনই বর্তমান ভারত নিয়ে নতুন করে ভাবার জায়গাও তৈরি করে।

You cannot copy content of this page