দুর্গাপুজোর আবহে নারীশক্তির কথা উঠে আসে বারবার। মা দুর্গার দশ হাত যেন শক্তি, সাহস এবং একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব সামলে নেওয়ার প্রতীক। তবে বাস্তব জীবনে নারীদের কাছ থেকে সব দায়িত্ব একা সামলে নেওয়ার প্রত্যাশা কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্নই তুলেছেন অভিনেত্রী সন্দীপ্তা সেন। পর্দায় পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের নজর কেড়েছেন তিনি। তবে শুধু অভিনয়ের জগতে নয়, বাস্তব জীবনেও সমাজের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নিজের মতামত জানাতে পিছপা হন না অভিনেত্রী। দেবীপক্ষের শুরুতে নারীদের সমাজে অবস্থান এবং তাঁদের প্রতিদিনের লড়াই নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি। সন্দীপ্তার মতে, সংসার, সন্তান এবং পেশা, সবকিছু সামলানোর দায়িত্ব শুধু নারীর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন নারীরও প্রয়োজন এমন একজন সঙ্গী, যিনি তাঁর দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবেন।
সন্দীপ্তার কথায়, সংসার চালানো শুধু একজনের দায়িত্ব নয়, বরং স্বামী-স্ত্রী দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গা। দাম্পত্যে দুজনেরই সমান দায়িত্ব থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, শুটিংয়ের কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে কখনও তাঁর স্বামী সৌম্য মুখোপাধ্যায় তাঁর জন্য স্যালাড তৈরি করে দেন। আবার সৌম্য ক্লান্ত থাকলে তাঁর যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন সন্দীপ্তা। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কে একে অপরের সুবিধা, অসুবিধা এবং ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছোটবেলায় নিজের বাবা-মায়ের সম্পর্কেও এমন পারস্পরিক বোঝাপড়া দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। সংসারের কাজ থেকে শুরু করে একে অপরের যত্ন নেওয়া, সব ক্ষেত্রেই দুজনের অংশগ্রহণ থাকলে জীবন অনেক সহজ হয়ে ওঠে বলেই মনে করেন তিনি।
সমাজে মেয়েদের কাছ থেকে ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব সামলে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। সংসার সামলানো, সন্তানকে বড় করা এবং নিজের পেশাগত জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলিতে নারীদেরই বেশি দায়িত্ব নিতে দেখা যায়। এই ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন সন্দীপ্তা। তাঁর কথায়, “আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতে হবে, সেটা তো হতে পারে না। এটা বহুবছর ধরে চলে আসা একটা নিয়ম। সময়ের সঙ্গে কিন্তু সেই নিয়মভাঙার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।” অর্থাৎ মেয়ে বলেই নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে, এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন তিনি। সময়ের সঙ্গে সমাজের চিন্তাভাবনায় বদল আসছে ঠিকই, কিন্তু পুরনো ধারণা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি। নারীর দায়িত্ব এবং তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমাজের এই বাঁধাধরা চিন্তাভাবনা বদলানো জরুরি বলেই মনে করেন অভিনেত্রী।
নারীদের সহ্যশক্তি এবং একসঙ্গে অনেক কাজ সামলে নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা প্রায়ই করা হয়। কিন্তু সেই প্রশংসার আড়ালে তাঁদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সন্দীপ্তা। শুটিংয়ের সময় শারীরিক পরিশ্রম করা হোক কিংবা ঋতুস্রাবের যন্ত্রণা নিয়েও কর্মস্থলে পৌঁছনো, প্রতিদিন নানা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় মহিলাদের। তবুও তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, তাঁরা সবকিছু সামলে স্বাভাবিকভাবে কাজ করে যাবেন। সন্দীপ্তার মতে, নারীদের মধ্যে অনেক দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতা থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে সব দায়িত্ব তাঁদের একাই নিতে হবে। দশভুজার সঙ্গে নারীদের তুলনা করার প্রচলিত ধারণা নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “এটাকে যদি আমি প্রতীক হিসেবে দেখি দশ হাত, কুড়ি হাত কিংবা দুটো হাত, যেটাই হোক, মেয়েদের মধ্যে এই ক্ষমতা রয়েছে। এটা জন্মগত।” তবে এই ক্ষমতার প্রশংসা করতে গিয়ে নারীদের বিশ্রাম এবং সাহায্য পাওয়ার প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা উচিত নয় বলেও মনে করেন অভিনেত্রী।
আরও পড়ুন: টালিগঞ্জ থেকে অ্যাপ ক্যাবে ফেরার পথেই ভয়াবহ দুর্ঘ’টনার কবলে অভিনেত্রী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়! ওই অবস্থাতেই করেন শুটিং, শুরু হয় বমি, কোমর ও হাঁটুতে গুরুতর আ’ঘাতে হাঁটাচলার ক্ষমতাও হারান! হাসপাতালে ভর্তি, কেমন আছেন সুজন নীলের স্ত্রী?
শুধু সংসার বা দাম্পত্য নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন সন্দীপ্তা। তাঁর মতে, প্রতিবাদ করার জন্য সবসময় চিৎকার করে কথা বলার প্রয়োজন নেই। শান্তভাবেও নিজের বক্তব্য দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা যায়। পরিবার হোক বা কর্মক্ষেত্র, কোথাও কোনও ভুল দেখলে নিজের আপত্তি জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর বক্তব্য, “আমি খুব সফ্টলি, লো ভয়েসে স্ট্রংলি কথা বলি। পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্র, ভুল দেখলে নিজের আপত্তি জানাই। কারণ প্রথম থেকেই সোচ্চার না হলে অনেকেই দুর্বল ভেবে বসে।” অর্থাৎ নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাকে দুর্বলতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেন তিনি। সন্দীপ্তার মতে, প্রথম থেকেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট না করলে অনেকেই অন্যের নীরবতাকে দুর্বলতা বলে ধরে নিতে পারেন। তাই পরিস্থিতি বুঝে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা জরুরি।
নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন বলে মনে করেন সন্দীপ্তা। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ধারণা রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের শুরু হতে পারে পরিবার থেকেই। বিশেষ করে ছোটবেলা থেকে ছেলেমেয়েদের কীভাবে বড় করা হচ্ছে, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ছেলেদের জন্য খেলনা গাড়ি আর মেয়েদের জন্য রান্নাবাটি, এমন আলাদা ধারণা শিশুদের মনে ছোট থেকেই বিভাজন তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, “ছেলেদের খেলনা গাড়ি আর মেয়েদের রান্নাবাটি, এমন ধারণা ছোট থেকেই বিভাজন তৈরি করে। একটা ছেলে-মেয়ে জন্ম থেকে কী শিখছে, কী দেখে বড় হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকেই শেখে কোন আচরণ স্বাভাবিক, কাকে কী দায়িত্ব নিতে হবে, কার মতামত কতটা। পরবর্তী প্রজন্মকে সমতার শিক্ষা দেওয়ার আগে নিজেদের জীবনেও সেই সমতা রাখা জরুরি।” অর্থাৎ আগামী প্রজন্মের মধ্যে সমান অধিকার ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হলে প্রথমে নিজেদের জীবনেই সেই চর্চা শুরু করতে হবে।






