বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর। সম্প্রতি ভগবান রাম ও শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সমালোচনার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমাও চাইতে হয়েছে তাঁকে। তবে এই ঘটনায় নতুন করে সরব হয়েছেন টলিউড অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে সরাসরি নাম না করেই বাগেশ্বর বাবাকে কটাক্ষ করেছেন তিনি। তাঁকে ‘ঢপেশ্বর’ বলে উল্লেখ করে অভিনেতা বুঝিয়ে দিয়েছেন, সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি তাঁর নজর এড়ায়নি। ঋত্বিকের এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ঘিরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য। পাশাপাশি দুর্গাপুজোয় বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে তাঁর আগের বিতর্কও নতুন করে চর্চায় ফিরে এসেছে।
নিজের পোস্টে ঋত্বিক লিখেছেন, ‘ঢপেশ্বর বলে এক বাবাজির, পুজোর আগে বাতেলা দিয়ে খুব টিআরপি বেড়েছিল। তারপর ওই ক্ষমা চেয়ে ব্যালান্স করে নেয়।’ এরপর পুরনো একটি ছড়ার ঢঙে ওই ধর্মগুরুকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্যের মূল নিশানা ছিল বিতর্কিত মন্তব্য করার পর সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি। পোস্টের শেষ অংশে আরও একবার কটাক্ষ করে ঋত্বিক লেখেন, ‘এখন আবার দেখছি সর্বাধিক বার ক্ষমা চাওয়ার বিরল রেকর্ড করতে গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে নাম লেখানোর দৌড়ে নেমেছে। রান বাবা রান…।’ অর্থাৎ, একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া এবং পরে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাকেই ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন অভিনেতা। তবে ঠিক কী মন্তব্য করেছিলেন বাগেশ্বর বাবা, যার জেরে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে মধ্যপ্রদেশের শিবপুরী জেলার করেরায় আয়োজিত একটি রামকথার অনুষ্ঠানে। সেখানেই রাম ও কৃষ্ণের তুলনা করতে গিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী।
ওই অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণের শারীরিক গঠন, দাঁড়ানোর ভঙ্গি এবং বাঁশি বাজানো নিয়ে মন্তব্য করেন বাগেশ্বর বাবা। তিনি বলেন, কৃষ্ণের ছবিতে তাঁকে প্রায়ই এদিক-ওদিক তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় এবং তাঁর শরীরের তিনটি জায়গা বাঁকা থাকে। পা দুটি আড়াআড়ি করে রাখা, কোমর একদিকে বাঁকানো এবং ঘাড় কাত করে বাঁশি বাজানোর বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। এরপর ভগবান রামের সঙ্গে তুলনা টেনে বলেন, রাম সোজা হয়ে দাঁড়ান, সোজা তাকান এবং সোজা পথে চলেন। অন্যদিকে, কৃষ্ণের দাঁড়ানো, তাকানো এবং চলার ভঙ্গি বাঁকা বলে মন্তব্য করেন তিনি। শুধু তাই নয়, মঞ্চে উপস্থিত একজন বাঁশিবাদকের উদাহরণ দিয়ে বাঁশি বাজানোকে খুব কঠিন কাজ নয় বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাঁশি বাজানো সাধারণ বিষয় হলেও ধনুক চালানো মোটেই সহজ কাজ নয়। এমন মন্তব্যের ভিডিয়ো সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মথুরার একাধিক সাধুসন্ত। তাঁদের বক্তব্য, রাম ও কৃষ্ণ একই পরমাত্মার দুই অবতার, তাই এ ভাবে তুলনা করা উচিত নয়।
ক্রমশ বিতর্ক বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজের মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তাঁর দাবি, বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং রাম ও কৃষ্ণের মধ্যে কোনও বিভেদ তৈরি করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। কোনও ভক্তের মনে তাঁর কথায় আঘাত লেগে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী বলেও জানান। পাশাপাশি নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গোপীদের সঙ্গে কৃষ্ণের কথোপকথন এবং বৈষ্ণব সাধুদের ভক্তিমূলক রচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, গোপীরা যেমন কৃষ্ণের সঙ্গে মজা করে কথা বলতেন, তেমনই ভক্তিমূলক রচনাতেও নানা ধরনের মজার অভিব্যক্তি ব্যবহার করা হয়। তিনি সেই ভাবনা থেকেই কথাগুলি বলেছিলেন বলে দাবি করেন। শাস্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি শ্রীকৃষ্ণের বিরোধী নই। তিনি আমাদের ঠাকুরজি।’ কৃষ্ণ জন্মভূমির মুক্তির দাবিতেও তাঁরা বারবার সরব হয়েছেন বলে জানান তিনি। নিজের নামের মধ্যেও কৃষ্ণের নাম রয়েছে বলে উল্লেখ করে তাঁর দাবি, তিনি নিজেও কৃষ্ণভক্ত এবং ব্রজের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। সমাজ বা দেবদেবীর মধ্যে বিভেদ তৈরি করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না বলেও স্পষ্ট করেন।
আরও পড়ুনঃ “শুরু থেকেই সৌরভকে দরকার ছিল বিগ বসের ঘরে, তাহলে পরিবেশটাই অন্যরকম হতো!” “কাউকে অপমান না করেও মজা করা যায়, শুধু ঝগড়া করলেই হয় না, ও সেটা জানে!” প্রথম থেকে থাকলে বদলে যেত খেলার চিত্র, মাঝপথে এসে কোন বিশেষ কারণে মন জিতেছেন সৌরভ দাস? মজার ছলে কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর কৌশলেই কি মুগ্ধ দর্শকরা, বিনোদনের নতুন সংজ্ঞা দিচ্ছেন অভিনেতা?
তবে বাগেশ্বর বাবাকে নিয়ে বাংলায় বিতর্কের সূত্রপাত কিন্তু এই প্রথম নয়। এর আগেও দুর্গাপুজোর সময় বাঙালির মাছ-মাংস খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। হাওড়ার লিলুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খাবার খাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। যাঁরা পুজোর দিনগুলিতে মাছ-মাংস খান, তাঁদের ‘পাখণ্ডী’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। পুজোর সময়ে আমিষ খাবার বিক্রি বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল, হিন্দু বাঙালিদের এবার জেগে ওঠা উচিত এবং দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস বা ডিম খাওয়া বন্ধ করা উচিত। তাঁর এই মন্তব্যের পর বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে বহু মানুষ প্রতিবাদে সরব হন। সেই সময়েও সমাজ মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করে বাগেশ্বর বাবাকে আক্রমণ করেছিলেন ঋত্বিক। ফলে রাম-কৃষ্ণ বিতর্কের পর আবারও ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিনেতার নতুন পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। বাগেশ্বর বাবার পরপর বিতর্ক এবং তাঁর ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাকেই নিজের পরিচিত ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী।






