সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলিং এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে কাউকে সমর্থন করতে গিয়ে যখন নিজের ধর্ম, পরিচয় এমনকী ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কুৎসার মুখে পড়তে হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা কতটা অস্বস্তিকর হতে পারে, তা অকপটে তুলে ধরলেন অভিনেত্রী মানসী সিনহা। বর্ষীয়ান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর গোমাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্কের সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন মানসী। তাঁর বক্তব্য ছিল, কে কী খাবেন, সেটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কিন্তু এই অবস্থান নেওয়ার পরেই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় তীব্র ট্রোলিং। এমনকী তাঁকে মুসলিম বলে প্রচার করা হয়, তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটূক্তি করা হয় এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও ছড়ানো হয় নানা ধরনের মিথ্যা কথা। সম্প্রতি সায়নের ‘অকপট’ সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অভিনেত্রী।
বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ মানসী সিনহা। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর অসাধারণ কমিক টাইমিং এবং ঝগড়ুটে চরিত্রে সাবলীল অভিনয়ের জন্য দর্শকদের কাছে বিশেষ পরিচিতি রয়েছে তাঁর। পর্দায় হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালকের ভূমিকাতেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তবে বাস্তব জীবনেও স্পষ্টবক্তা মানসী। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সমালোচনা বা ট্রোলিংয়ের ভয় পান না তিনি। সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, ৩৩ বছরের দাম্পত্য, সন্তান দত্তক নেওয়া থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিকর মন্তব্যের অভিজ্ঞতা, একাধিক বিষয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী। তবে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর বিতর্ককে কেন্দ্র করে তাঁর নিজের পরিচয় নিয়ে যে ধরনের আক্রমণ হয়েছে, সেটাই বিশেষভাবে উঠে এসেছে আলোচনায়।
বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী একসময় জানিয়েছিলেন, তিনি গোমাংস খেয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় বিতর্ক। প্রবীণ অভিনেতাকে নিয়ে ট্রোলিংয়ের পাশাপাশি তাঁর ছবি বিকৃত করে জুতোর মালা পরানো এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করার মতো ঘটনাও সামনে আসে। বিষয়টি মানতে পারেননি মানসী। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, কেউ গোমাংস খাবেন কি না, সেটা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি নিজে কখনও গোমাংস খাননি, ভবিষ্যতেও খাওয়ার ইচ্ছা নেই। কিন্তু নিজের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্যের পছন্দকে মিলিয়ে দেখা বা কাউকে আক্রমণ করার কোনও যুক্তি নেই। তাঁর কথায়, খাবারের পছন্দ ধর্মীয় কারণেও হতে পারে, আবার শুধুই স্বাদের কারণেও হতে পারে। তাই সমালোচনা থাকলে তা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। কাউকে অপমান করা বা তাঁর ছবি বিকৃত করে অসম্মান করা কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও আবেদন করেছিলেন তিনি।
কিন্তু বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর পাশে দাঁড়ানোর পরেই যেন আক্রমণের নিশানা হয়ে যান মানসী নিজে। অভিনেত্রীর অভিযোগ, বহু মানুষ তাঁকে মুসলিম বলে দাবি করতে শুরু করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি মুসলিম পরিবারের মেয়ে এবং মুর্শিদাবাদের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছেন। এমনকী তাঁর স্বামীর নাম আলম বলেও প্রচার করা হয়। মানসীর কথায়, তাঁর স্বামী শঙ্খকে নিয়েও এমন সব মিথ্যা পরিচয় ছড়ানো হয়েছিল যে বিষয়টি শুনে তিনিও অবাক হয়ে যান। অভিনেত্রী জানান, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ তাঁকে ঠাকুরঘরে ঢোকার অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন। কেউ আবার তাঁকে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার পরামর্শও দেন। এই সমস্ত মন্তব্যের জবাবও দিয়েছিলেন তিনি। এমনকী ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানতে চেয়েছিলেন, গরুকে যদি মাতৃরূপে পুজো করা হয়, তাহলে ছাগলের দুধ খেয়ে বড় হওয়া মানুষদের ক্ষেত্রে ছাগলকে কেন একইভাবে দেখা হয় না? যদিও তাঁর এই প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর পাননি বলেই জানান অভিনেত্রী।
আরও পড়ুনঃ “প্রধানমন্ত্রীর স্কিমগুলো ভারতীয়দের জন্য, রাষ্ট্রবাদী মানেই পিছিয়ে পড়াদের এগিয়ে আনা”, “কেউ সেই উন্নতি করেনি, অধীর রঞ্জন হোক বা সেই বাবা-ছেলে” “ধর্ম নয়, দেশের প্রতিটি মানুষের উন্নয়নই বিজেপির লক্ষ্য!” অধীর রঞ্জন চৌধুরী সহ কাদের নিশানা করে বি*স্ফোরক কৌশিক রায়? দুর্নী’তিমুক্ত সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোন পরিবর্তনের বার্তা তাঁর?
তবে ট্রোলিংয়ের ঘটনা এখানেই থামেনি। মানসী জানান, তাঁর গুরু ও প্রয়াত অভিনেতা পঙ্কজ মুন্সিকে নিয়ে একটি স্মৃতিচারণমূলক পোস্টেও অত্যন্ত কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়েছিল। সেই মন্তব্যের অর্থ বুঝতে না পেরে গুগলে খুঁজে দেখেন তিনি। বিষয়টি জানার পর মানসী সেই মন্তব্যকারীকে সরিয়ে দেন এবং নিজের পোস্টের কমেন্ট করার সুযোগও সীমিত করে দেন। তাঁর কথায়, এতদিন সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করলেও এই অভিজ্ঞতার পর বুঝেছেন, ভার্চুয়াল জগতে অনেক কুরুচিপূর্ণ মানুষ রয়েছেন। তাই মানসী স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চুপ করে থাকার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই। বরং প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান আরও জোরালোভাবেই তুলে ধরবেন। বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর হয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও পরিবারকে নিয়েও এমন আক্রমণের মুখে পড়তে হবে, তা হয়তো ভাবেননি অভিনেত্রী। কিন্তু ট্রোলিংয়ের কাছে মাথা নত না করে নিজের বক্তব্যে অনড় থাকাই এখন তাঁর অবস্থান।






