সিনেমার পর্দায় যখন নায়ক-নায়িকাদের সাহসিকতা, অ্যাকশন আর রোম্যান্স দেখে দর্শক মুগ্ধ হন, তখন ক্যামেরার পিছনে থেকে যান এমন অনেক মানুষ, যাঁদের পরিশ্রম ছাড়া সেই দৃশ্যগুলি বাস্তবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তাঁদের মুখ দর্শক চেনেন না, নামও হয়তো জানেন না। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে যান তাঁরা। সিনেমা শেষ হলে নায়ক-নায়িকারা দর্শকদের ভালোবাসা পেলেও পর্দার আড়ালের এই শিল্পীদের অনেকের জীবনেই থেকে যায় অবহেলা, অনিশ্চয়তা আর একাকিত্বের অন্ধকার। কাজ করেও পরিচিতি না পাওয়ার যন্ত্রণা যে কতটা গভীর, তা আরও একবার সামনে আনলেন এক স্টান্টম্যান।
চিত্ত কবিরাজ, যিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাংলা ছবির জগতে স্টান্টম্যান হিসেবে কাজ করছেন তিনি। একাধিক ছবিতে জনপ্রিয় অভিনেতাদের ডামি হিসেবে বিপজ্জনক অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের কিছু তিক্ত বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর কথায়, দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেও অনেক সময় অভিনেতারা তাঁদের চিনতে পারেন না। এমনকী কোনও শিল্পীর সঙ্গে প্রায় ২০টি প্রজেক্টে কাজ করার পরেও তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকলে সেই অভিনেতা তাঁকে চিনতে পারেন না। এই অভিজ্ঞতা যে কতটা কষ্টের, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট।
তবে শুধু পরিচিতি না পাওয়ার যন্ত্রণা নয়, কাজের সময় জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে চিত্ত কবিরাজের ঝুলিতে। বিশেষ করে ‘রক্তবীজ’ ছবির ক্লাইম্যাক্সের অ্যাকশন দৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেখানে প্রায় ১২০ ফুট উঁচু একটি টাওয়ারে দীর্ঘ লড়াইয়ের দৃশ্য শুট করা হয়েছিল। সেই দৃশ্যে আবির চট্টোপাধ্যায়ের ডামি হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। শুধু আবির নন, অঙ্কুশের জন্যও একাধিকবার স্টান্ট করেছেন। টাওয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং করাটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে তাঁকে সেখানে থেকে লড়াইয়ের দৃশ্য করতে হয়েছিল।
সেই শুটিংয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানিয়ে চিত্ত বলেন, টাওয়ারের উপরে প্রায় ১০০টি হ্যালোজেন আলো জ্বলছিল। সেগুলি মাত্র ৫০ মিনিটের জন্য ব্যবহারের উপযোগী ছিল। অথচ শুটিং শেষ হতে লেগে যায় প্রায় ছয় ঘণ্টা। এর পাশাপাশি একটি দৃশ্যে তাঁকে উঁচু টাওয়ার থেকে ঝুলেও থাকতে হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো এটাই তাঁর শেষ ছবি। আর পারছেন না, সবকিছু ছেড়ে নেমে যেতে ইচ্ছে করছিল। সেই মুহূর্তে কাজের চাপ এবং শারীরিক কষ্টের সঙ্গে লড়াই করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উল্লেখ্য, কথোপকথনে তিনি প্রথমে ১৪০ ফুট বললেও পরে নিজের ভুল সংশোধন করে টাওয়ারটির উচ্চতা ১২০ ফুট বলে জানান।
আরও পড়ুনঃ “সালমান খানের মতো ব্যক্তিত্ব বা মেজাজ আমার নেই, ফাস্ট ও স্পিন বোলিং সম্পূর্ণ আলাদা দক্ষতার…ওঁর মতো হতে পারবই না!” বিগ বস বাংলায় সঞ্চালনা নিয়ে বারবার ভাইজানের সঙ্গে তুলনা, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ মানতে নারাজ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়? সমালোচকদের উদ্দেশে এবার সপাটে কী জবাব দিলেন দাদা?
তবে এত কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যেও একটি মুহূর্ত আজও তাঁর মনে বিশেষ জায়গা করে রয়েছে। শুটিং শেষ করে নীচে নামার পর পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁকে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন। চিত্তের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় পুরস্কার। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, অসুস্থতা বা বিপদের সময় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেক স্টান্টম্যান ও কর্মী একাকিত্বে ভোগেন। তাঁদের খোঁজখবর নিতে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব ছাড়া ইন্ডাস্ট্রির মানুষের খুব একটা দেখা মেলে না। তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, পর্দায় নায়কের বীরত্ব ফুটিয়ে তুলতে যাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রাখেন, তাঁদের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ কতজন?






