যে গান বাঙালির মুখে মুখে ফেরে, আজও দুর্গাপুজোয় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক! ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ গেয়েই জনপ্রিয়তার শীর্ষে মিতা চট্টোপাধ্যায়! অথচ গানটি সুপারহিট হলেও বন্ধ হয়ে যায় ক্যাসেট কোম্পানি! কেন এমনটা ঘটেছিল ‘আশাকণ্ঠী’ গায়িকার সঙ্গে? কীভাবে রাতারাতি বদলে গেল জীবনে?

বাংলা গানের জগতে এমন কিছু গান রয়েছে, যা শুনলেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে পুরনো দিনের স্মৃতি। বিয়ের অনুষ্ঠান হোক কিংবা পুজোর দুপুর, ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ গানটি আজও শ্রোতাদের মনে আলাদা জায়গা করে রেখেছে। এই গানের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে গায়িকা মিতা চট্টোপাধ্যায়ের নাম। নব্বইয়ের দশকে মুক্তি পাওয়া এই গান তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে মজার বিষয় হল, প্রথমবার প্রকাশিত হওয়ার সময় গানটি কিন্তু তেমন সাফল্য পায়নি। বরং গানটি যে ক্যাসেট কোম্পানির মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিও পরে বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি পুরনো এক সাক্ষাৎকারে মিতা চট্টোপাধ্যায়ের বলা কথা থেকেই সামনে এসেছে এই জনপ্রিয় গানের পিছনের অজানা ইতিহাস।

মিতা চট্টোপাধ্যায়কে অনেকেই একসময় ‘আশাকণ্ঠী’ বলে চিনতেন। কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলের বাংলা গান নিজের কণ্ঠে গেয়ে শ্রোতাদের প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি। তবে অন্যের গানের ধরন অনুসরণ করলেও নিজের গায়কী দিয়ে আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন মিতা। তাঁর কথায়, “আশাজির গান গাই, এতে অপমানের কিছু নেই। তবে ওই যে একটা নির্দিষ্ট স্ট্যাম্প বা তকমা সেঁটে দেওয়া হতো, সেটা কেমন যেন লাগত। আমি কখনওই ওঁর কণ্ঠ নকল করি না, শুধু ওঁর গানের স্টাইলটা অনুসরণ করি।” অর্থাৎ আশা ভোঁসলের গানের ধরন অনুসরণ করাকে তিনি কখনও অসম্মানজনক বলে মনে করেননি। কিন্তু সবসময় একই পরিচয়ে আটকে থাকতে চাননি এই শিল্পী। নিজের প্রতিভা ও গায়কীর জোরে আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

১৯৯৩ সালে প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিল ‘পালকিতে বউ চলে যায়’। কিন্তু সেই সময় গানটি শ্রোতাদের মধ্যে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এখন যে গান বাঙালির বিয়েবাড়ি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত শোনা যায়, প্রথম প্রকাশের সময় তার ভাগ্য ছিল একেবারেই আলাদা। আরও আশ্চর্যের বিষয়, গানটি যে ক্যাসেট কোম্পানির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি গানটির বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রথমবার গানটি প্রকাশিত হওয়ার পর মিতা চট্টোপাধ্যায়ের কেরিয়ারে তেমন কোনও বড় পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পরিস্থিতি। প্রথমবার প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও গানটির ভবিষ্যৎ যে একেবারেই অন্যরকম হতে চলেছে, তা তখন কেউই বুঝতে পারেননি। পরে এই গানই তাঁর জীবনের অন্যতম বড় পরিচয় হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ কয়েক বছর পর, ২০০০ সালে অন্য একটি রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন মিতা চট্টোপাধ্যায়। সেই কোম্পানির মাধ্যমেই নতুন করে প্রকাশ করা হয় ‘পালকিতে বউ চলে যায়’। আর দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হওয়ার পরেই বদলে যায় গানের ভাগ্য। অল্প সময়ের মধ্যেই গানটি ছড়িয়ে পড়ে শ্রোতাদের মুখে মুখে। বাঙালির বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে গানটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। যে গান প্রথমবার প্রকাশিত হয়ে তেমন সাফল্য পায়নি, সেটিই পরে বাংলা গানের জগতে বিশেষ জায়গা করে নেয়। এই একটি গানই মিতার পরিচিতিকে আরও বড় করে তোলে। আর তাঁকে শুধু ‘আশাকণ্ঠী’ হিসেবে নয়, নিজের গায়কীর জন্যও চিনতে শুরু করেন শ্রোতারা। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ তাই আজও এক পরিচিত নাম।

আরও পড়ুনঃ “বাংলা সিরিয়ালের জন্যই টলিউড টিকে আছে…যতই দেব আর জিৎ থাকুক ইন্ডাস্ট্রি তো কবেই ম’রতে বসেছে, টেলিভিশনই বাঁচিয়ে রেখেছে!” মেগাস্টার ও সুপারস্টার আর চলে না, বাংলা বিনোদন জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে চাঁচাছোলা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী! ছোটপর্দার চিত্রনাট্য গল্পই কি বাংলা ছবিকে করতে পারে সুপারহিট? কী বললেন বর্ষীয়ান অভিনেতা?

তবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলা গানের জগতে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে গানের জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন মিতা চট্টোপাধ্যায়। এখন নিজের গানের স্কুল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তিনি। সেখানে গান শেখানো এবং সংগীতচর্চার মধ্য দিয়েই সময় কাটে তাঁর। একসময় যে গান তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলেছিল, সেই গান আজও শ্রোতাদের মনে নস্ট্যালজিয়া ফিরিয়ে আনে। প্রথম প্রকাশের সময় ব্যর্থতা, ক্যাসেট কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বহু বছর পর নতুন করে প্রকাশিত হয়ে বিপুল সাফল্য, এই পুরো ঘটনাই গানটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আশ্চর্য ইতিহাস। মিতা চট্টোপাধ্যায়ের কেরিয়ারেও এই গান ছিল এক বড় মোড়। সময় পেরিয়ে গেলেও ‘পালকিতে বউ চলে যায়’ গানটির জনপ্রিয়তা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি আজও বাঙালির কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

You cannot copy content of this page