বাংলা চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিনোদন জগতে। একসময় বড় পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, অভিনয় দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ছায়া দেবী-সহ বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক বিশিষ্ট শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেও ধীরে ধীরে অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন অভিনেত্রী। পরবর্তীকালে তাঁকে আর নিয়মিত পর্দায় দেখা যায়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ সামনে আসতেই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন পরিচিতজনেরা। অভিনেত্রীর প্রয়াণের পর তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে তাঁর দুই বোনের কথায় উঠে এসেছে মিঠুর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা দিক, অভিনয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ এবং জীবনের একের পর এক আঘাতের কথা।
মিঠু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় প্রতিভা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের স্মৃতিচারণে উঠে আসে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার প্রসঙ্গ। তাঁর কথায়, মিঠু এমন এক অভিনেত্রী ছিলেন, যিনি সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ছায়া দেবীর মতো দক্ষ শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করতে পারতেন। তাঁর সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয়ক্ষমতা তাঁকে নায়িকা হিসেবে বিশেষ জায়গা করে দিয়েছিল। কিন্তু এত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলা ছবিতে তাঁর কাজের সংখ্যা ক্রমশ কমে গেল, সেই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ছিল অনুরাগীদের মনে। এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর পরিবারের সদস্যরা জানান, মিঠু যেকোনও ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হতেন না। ভালো গল্প, ভালো পরিচালক এবং নিজের পছন্দমতো চরিত্র না পেলে তিনি কাজ করতে চাইতেন না। শুধুমাত্র পর্দায় উপস্থিত থাকার জন্য নিম্নমানের ছবিতে অভিনয় করার পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি। বরং ভালো চিত্রনাট্যের অপেক্ষায় থাকতেন।
তাঁর এই নিজস্ব সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে অভিনয়ের সুযোগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল বলে পরিবারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। অভিনেত্রীর সেজ বোন রূপা চৌধুরী জানান, মিঠুর জীবনে একের পর এক ব্যক্তিগত আঘাত এসেছিল। পরিবারের কথায়, উত্তমকুমারের সঙ্গে একটি ছবিতে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল মিঠুর। ‘সেতুবন্ধন’ এবং ‘সম্রাট’ নামের দুটি ছবির প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁদের স্মৃতিচারণে। কিন্তু উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বিশেষ করে তাঁকে কেন্দ্র করে যে ছবির ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অভিনেত্রীর কাছে এটি ছিল বড় ধাক্কা। এর পরেই পরিবারে নেমে আসে আরও এক দুঃসংবাদ। রূপা জানান, তাঁর বড় দিদির মেয়ে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারে মারা যান।
এই ব্যক্তিগত ক্ষতি মিঠুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরিবারের সদস্যদের কথায়, ওই ঘটনার পর অভিনয় কিংবা নতুন কাজের দিকে মন দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে পরিবারের সকলে তাঁকে আবার কাজে ফেরানোর চেষ্টা করেন। নতুন চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা হয়, কাজের প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাগুলিও আর বাস্তবায়িত হয়নি। মিঠুর আর এক বোনের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে অভিনেত্রীর সঙ্গে পরিবারের নিবিড় সম্পর্কের কথা। পরিবারের কাছে তিনি কখনও শুধুমাত্র একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা ছিলেন না, বরং ছিলেন ঘরের মেয়ে, আদরের দিদি। বোনের কথায়, মিঠু খুবই আবেগপ্রবণ এবং পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ ছিলেন। নিজের অসুস্থতার সময়েও ভাইবোনদের পছন্দ-অপছন্দের কথা ভুলতেন না।
একবার পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দেখতে গেলে ভাইয়ের মাটন খাওয়ার অভ্যাসের কথা মনে রেখে তাঁর জন্য মাটন রান্না করার কথাও বলেছিলেন তিনি। রান্না করে খাওয়ানো, নতুন নতুন পদ তৈরি করা এবং পরিবারের সকলকে একসঙ্গে নিয়ে আনন্দ করতেই ভালোবাসতেন মিঠু। অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরীকে তিনি দ্বিতীয় মায়ের মতো সম্মান করতেন বলেও জানান পরিবারের সদস্যরা। আত্মীয়তার আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরে তাঁদের পরিবারের বন্ধন ছিল অত্যন্ত গভীর। মিঠু দূরে থাকলেও পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা জন্মদিনে তাঁকে ভিডিওর মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করা হতো। অভিনয় জগতের ঝলমলে জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর মিঠু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বহু পরিচিত মানুষের যোগাযোগও ধীরে ধীরে কমে গিয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ “তুমি কি আমার জীবনের ও মৃ’ত্যুর আগে শেষ সাত মিনিট হবে?” নন্দিনীকে লেখা প্রেমপত্রের শেষ লাইনে রাজবীরের এই বিশেষ বার্তা! ‘সত্যিই ব্যাপারটা খুব সুন্দর’ প্রস্তাবের ধরন দেখে মুগ্ধ দর্শকরা! তবে জানেন কি, বিগ বস প্রতিযোগীর প্রেম নিবেদনে ব্যবহৃত ‘৭ মিনিট’-এর নেপথ্যে রয়েছে কোন গভীর অর্থ?
তাঁর বোনদের কথায়, ২০২৫ সালে মুম্বইয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি আর কলকাতায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা জানান, মিঠু একসময় সকলকে নিয়ে বড় কোনও কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিগত শোক সেই পরিকল্পনাগুলিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভেঙে পড়েন দীর্ঘদিনের পরিচিতরাও। পরিবারের কাছে আজও মিঠু শুধুমাত্র একজন প্রতিভাবান অভিনেত্রী নন, বরং ভালোবাসায় সকলকে আগলে রাখা এক মানুষ। তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের এই অজানা অধ্যায়গুলি সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে একসময়ের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর জীবনসংগ্রাম।






