বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্পী মহলের একাংশকে ঘিরে নানান আলোচনা ও সমালোচনা সামনে আসছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেতা ‘সপ্তর্ষি মৌলিক’ (Saptarshi Moulik) এবং তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী ‘সোহিনী সেনগুপ্ত’ (Sohini Sengupta)। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন শাসকদলের ঘনিষ্ঠ বলে যে অভিযোগ উঠছে, তা সরাসরি অস্বীকার করেন সপ্তর্ষি। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না, আমাকে কেউ ভুল বুঝছেন আমি যেই কাজটা করে যাচ্ছি ৫ বছর থেকে, আজ ৫২ বছর বয়সেও একই কাজ করে যাচ্ছি। যে কত বছর বাঁচব, করে যাব, সেটা হচ্ছে অভিনয়। অভিনয় আমার রাজনীতি, অভিনয় আমার জীবন, অভিনয় আমার সবকিছু।”
তাঁর বক্তব্য, মানুষ যেমন তাঁকে ভালোবাসেন, তেমন কোনও রাজনৈতিক দলও পছন্দ করতে পারে, কিন্তু সেটাকে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে দেখেন না। অভিনয় এবং থিয়েটারই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় বলেই জানান তিনি। সপ্তর্ষি আরও বলেন, “এটার জন্য আমাকে যেমন মানুষ ভালোবাসেন কখনও কখনও কোনো পার্টি এসে আমাকে ভালোবাসেন সেটাতে তো আমার কিছু করার নেই!” তিনি জানান, অভিনয়ই তাঁর ঈশ্বর এবং শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই কাজ করেই যেতে চান। অভিনেতার কথায়, “আমি যে কাজটা জানি, যে কাজটা করতে পারি, মরার আগে পর্যন্তও সেটাই আমার পলিটিক্স, সেটাই আমার ভগবান।”
সমালোচনা বা বিতর্ককে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান না বলেও জানান। তাঁর মতে, দর্শকই শেষ কথা বলেন। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি যদি আজ খুব বাজে অভিনয় করতাম, লোকেরা আমাকে তুলে দূরে নিক্ষেপ করে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। যখন এখনও অবধি নিক্ষেপ করে ফেলেনি তার মানে আমি খুব একটা খারাপ অভিনয় করি না।” ভালো অভিনয়ের স্বীকৃতিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রাজনীতি ও ক্ষমতার আসন নিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়েও স্পষ্ট বার্তা দেন সপ্তর্ষি। তিনি বলেন, “এখন আমাদের যিনি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সাথেও আমার একবার আলাপ হয়েছিল।
আমি একটি ছবি করতে যাচ্ছিলাম, তিনিও যদি আমাকে কোনোদিন যেতে বলেন নিশ্চয়ই যাব আমি।” পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, “আজ যদি আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ মোদিজির সাথে না মেলে…সবকিছুর শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রী ভারতের। উনি যদি আমাকে কোথাও যেতে বলেন আমি কি যাব না!” তাঁর মতে, যে কোনও সাংবিধানিক পদ ও দায়িত্বকে সম্মান করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, রাজনীতির জটিল হিসাব তিনি খুব একটা বোঝেন না। তাঁর কথায়, “আমি না অতটা বুদ্ধিমান নই আর কি এইসব ব্যাপারে! আমি আমার ওই অভিনয় করাটাই শুধু জানি এবং ওইটাই বাঁচি!”
শিল্পী সমাজ এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সপ্তর্ষি জানান, অতীতে বহু শিল্পী বিভিন্ন সময়ে শাসকদলের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছেন বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তাঁর মতে, সেই কারণে এখন সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে অনেককেই। তিনি বলেন, “তৃণমূলের সময় কিন্তু বহু শিল্পীরা প্রচুর সাহায্য নিয়েছেন এবং গা ঘষাঘষি করেছেন! অভিনেতা হিসেবে আমার গোষ্ঠীর লোকের যদি ৭০ শতাংশ মানুষের পলিটিক্যাল ভিউ একরকম হয়ে যায় সুযোগ সুবিধার জন্য, ৩০ শতাংশের মধ্যে থেকে আমার ভিউ না হলেও আমাকে শুনতে হবে।”
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে মানুষ সব বুঝে যান এবং দীর্ঘ সময় ধরে নিজের আসল অবস্থান লুকিয়ে রাখা যায় না। তাঁর মতে, প্রত্যেকেরই নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত এবং “কেউ যদি বলতে চান তাঁকে বলতে দেওয়া উচিত। আশা রাখছি যে, সব ভালো হবে। আমি ওঁর থেকে অনেক বছর আগে থিয়েটার করছি, আমি এটা জানি, আমি না সারাজীবন থিয়েটারে অর্থাভাব দেখেছি।” তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক সমস্যা কখনও তাঁকে থামাতে পারেনি।
আরও পড়ুনঃ “বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেখে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম” বড় মেয়ে রূপসা চক্রবর্তীকে নিয়ে আবেগে ভাসলেন বাবা আলোক চ্যাটার্জী! কেন এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন তিনি? সংসার থেকে ছোটপর্দায়, অতি সাধারণ মেয়ে হয়েও কীভাবে রূপকথার গল্প লিখেছেন অভিনেত্রী?
সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাকে গুলি করে মেরে দিক তারপরে হয়ত আমি কাজটা বন্ধ করব।” কথার মাঝেই সপ্তর্ষি জানান, “সোহিনী বারবার বলে এক রাস্তায় দাঁড়িয়ে করতে পারি!” এর জবাবে অভিনেত্রী বলেন, “ “একটা সময় আমাদেরও কেউ কেউ বলেছিলেন কোনো হল আমরা পাবো না। আমি তখন ভেবেছি রাস্তায় চাদর পেতে আমি থিয়েটার করব, অভিনয় করব। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।” তাঁর মতে, থিয়েটারের মানুষ এত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন যে এখন আর কোনও বাধাকেই ভয় পান না। তাই ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি আশাবাদী।






