বাংলা টেলিভিশনের জগতে এমন অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা কখনও নায়ক বা নায়িকার আসনে না বসেও দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। অনেক সময় জীবনের পরিকল্পনা একরকম হলেও ভাগ্য মানুষকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথে। কেউ ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের স্বপ্ন দেখেন, আবার কেউ কোনওদিন ভাবতেও পারেন না যে একদিন তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষই হয়ে ওঠেন দর্শকদের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। বাংলা ধারাবাহিকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রূপসা চক্রবর্তীর জীবনকাহিনীও অনেকটা তেমনই। নায়িকা হওয়ার সমস্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। তাঁর অভিনয়, সাবলীল সংলাপ বলা, প্রাণবন্ত হাসি এবং সহজাত ব্যক্তিত্ব তাঁকে দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির অত্যন্ত পরিচিত মুখ রূপসা চক্রবর্তী। বহু জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁকে কখনও বৌদি, কখনও ননদ, কখনও বা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের ভূমিকায় দেখা গেছে। তবে অভিনয়ই যে তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল, এমনটা কিন্তু নয়। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা এবং গান নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এমনকি একাধিক ধারাবাহিকে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবেও কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিচয় হয় প্রযোজক ও পরিচালক স্নেহাশিস চক্রবর্তীর সঙ্গে। সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারপর বিয়ে। সংসার, সন্তান এবং পড়াশোনার মধ্যেই নিজের জীবনকে গুছিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। মাস্টার্স সম্পূর্ণ করার পর পিএইচডি নিয়েও এগোচ্ছিলেন। অভিনয়ের জগতে আসার কোনও পরিকল্পনাই ছিল না তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম।
রূপসার অভিনয়ে আসার গল্পটাও বেশ মজার। সেই সময় স্নেহাশিস চক্রবর্তী তাঁর ধারাবাহিকের জন্য নতুন একটি মুখ খুঁজছিলেন। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও পছন্দসই কাউকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর কাছেই প্রস্তাব নিয়ে আসেন। রূপসাকে তিনি বলেন, একবার অভিনয় করে দেখতে, ভালো না লাগলে বা কাজ ঠিকমতো না হলে তিনি নিজেই তাঁকে অভিনয় থেকে সরিয়ে দেবেন। কিন্তু স্বামীর এই কথাই যেন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় রূপসার কাছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিনয় তাঁর রক্তে রয়েছে। কারণ তাঁর পরিবারে অভিনয়ের ঐতিহ্য ছিল দীর্ঘদিনের। নিজের আত্মবিশ্বাস এবং ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে তিনি অভিনয়ের সুযোগ গ্রহণ করেন। আর সেই একটি সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ। প্রথম কাজ থেকেই দর্শকদের নজর কেড়ে নেন তিনি এবং ধীরে ধীরে বাংলা ধারাবাহিকের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
এরপর একের পর এক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন রূপসা। ‘জড়োয়ার ঝুমকো’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘খোকাবাবু’, ‘কলের বউ’, ‘রাখিবন্ধন’, ‘জীবনসাথী’, ‘বেনে বউ’, ‘গঙ্গারাম’ থেকে শুরু করে ‘জগদ্ধাত্রী’ একাধিক সফল ধারাবাহিকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। যদিও তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন, তবুও নিজের অভিনয় দক্ষতার জোরে প্রতিটি চরিত্রকে আলাদা করে মনে রাখার মতো করে তুলেছেন। তাঁর অভিনয়ে যেমন আবেগ থাকে, তেমনই থাকে বাস্তবতার ছোঁয়া। তাই পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের কাছে একটি নির্ভরতার জায়গা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন যে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য সবসময় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই।
আরও পড়ুনঃ বাবা ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং মা অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা, ৩২ বছর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরি সামলে অভিনয়ে সাফল্যের শিখরে অনুসূয়া মজুমদার! ব্যক্তিগত জীবন থেকে অভিনয়জগতের অজানা গল্প ভাগ করলেন অভিনেত্রী! আজকের ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কি আছে তিক্ততা?
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে রূপসা চক্রবর্তী তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে আড্ডায় বসে জীবনের নানা অজানা গল্প তুলে ধরেন। সেখানে তাঁর মা জানান, ছোটবেলায় রূপসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে অভিনয় করতেন ঠিকই, কিন্তু কখনও অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন না। অন্যদিকে তাঁর বাবা, বিশিষ্ট অভিনেতা আলোক চ্যাটার্জী, বহু বছর ধরে বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মেয়ের অভিনয় জীবন শুরু হবে, এমনটা তিনিও ভাবেননি। সেই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে পরিবারের আবেগঘন মুহূর্তও। রূপসা তাঁদের বড় মেয়ে হওয়ায় বিয়ের পর তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে দেখে তাঁর বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। নিজেই সেই কথা স্বীকার করেছেন তিনি। তবে আজ মেয়ের সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং অভিনয় জীবনের উত্থান দেখে গর্বিত গোটা পরিবার। যে মেয়ে কোনওদিন অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি, তিনিই আজ বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম পরিচিত এবং প্রিয় মুখ, রূপসা চক্রবর্তীর জীবনের এই যাত্রাপথ সত্যিই অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প।






