বাবা ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং মা অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা, ৩২ বছর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরি সামলে অভিনয়ে সাফল্যের শিখরে অনুসূয়া মজুমদার! ব্যক্তিগত জীবন থেকে অভিনয়জগতের অজানা গল্প ভাগ করলেন অভিনেত্রী! আজকের ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কি আছে তিক্ততা?

অনুসূয়া মজুমদার (Anashua Majumdar) বাংলা অভিনয় জগতের এমন এক পরিচিত মুখ, যিনি মঞ্চ, টেলিভিশন এবং বড়পর্দা তিন ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন কয়েক দশক ধরে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ অভিনয়জীবন, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, কর্মজীবন এবং সাফল্যের নেপথ্যের নানা অজানা গল্প তুলে ধরলেন তিনি। অনেকেরই ধারণা ছিল অভিনয়ই তাঁর একমাত্র পেশা। কিন্তু বাস্তবে একটি নামী বহুজাতিক সংস্থায় দীর্ঘ ৩২ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন অনুসূয়া। চাকরি সামলানোর পাশাপাশি সমান নিষ্ঠায় চালিয়ে গিয়েছেন থিয়েটার, ধারাবাহিক ও সিনেমার কাজ। অভিনেত্রীর কথায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি শতভাগ মনোযোগ দিয়েছেন। অফিসে থাকাকালীন শুধুই অফিসের কাজ এবং মঞ্চ বা শুটিংয়ে থাকলে শুধুই অভিনয় এই কঠোর শৃঙ্খলাই তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

নিবেদিতা অনলাইনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনুসূয়া জানান, অভিনয়জীবনে এমনও বহুবার হয়েছে যখন কোনও চরিত্র তাঁর করার কথা ছিল, সবকিছু চূড়ান্তও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁকে আর নেওয়া হয়নি। কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই অন্য কাউকে সেই চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। তবে এসব নিয়ে কখনও প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখাননি তিনি। বরং নিজের কাজের উপরই ভরসা রেখেছেন। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বাংলা বাণিজ্যিক ছবির জগতে তাঁকে বড় পরিচিতি এনে দিয়েছিল নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘গোত্র’ ছবি। অভিনেত্রীর কথায়, বহু বছর অভিনয় করলেও সাধারণ দর্শকের মধ্যে যে বাণিজ্যিক পরিচিতি তিনি পেয়েছেন, তার বড় কৃতিত্ব ‘গোত্র’-র। এজন্য তিনি নন্দিতা-শিবপ্রসাদের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি ‘কালপুরুষ’-এর প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেই ছবি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও তিনি জানান, ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন এবং কাজটি তাঁর অভিনয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

 

নিজের শিকড়ের কথাও খোলাখুলি বলেছেন অনুসূয়া। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে। বাবা ছিলেন একটি বড় শিল্প সংস্থার চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং মা ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা ও আধুনিক চিন্তাধারার মানুষ। পরিবারের পরিবেশ ছিল একদিকে শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক, অন্যদিকে যথেষ্ট উদার। অভিনেত্রী জানান, তিনি নিজেকে নিপাট বাঙালি বললেও বড় হয়েছেন অনেকটাই পশ্চিমি সংস্কৃতির আবহে। বাড়িতে ইংরেজি ও হিন্দির চর্চা বেশি ছিল। বাংলা ভাষায় স্বচ্ছন্দ হতে তাঁকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। এমনকি থিয়েটারে যোগ দেওয়ার সময় তাঁর বাংলা পড়া ও লেখার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু নিজের আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের জোরে সেই বাধা অতিক্রম করেন। তাঁর কথায়, মা সবসময় বলতেন, কোনও প্রতিভাকে নষ্ট করা উচিত নয়। আর বাবার শিক্ষা ছিল ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’। সেই মূল্যবোধই আজও তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি।

থিয়েটারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল, সেটাও উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। বহুরূপী, চেনামুখ-সহ বিভিন্ন নাট্যদলে কাজ করেছেন তিনি। কিংবদন্তি তৃপ্তি মিত্র, শাঁওলি মিত্র, রমাপ্রসাদ বণিকদের মতো ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অভিনয়ের শিক্ষা পেয়েছেন। অনুসূয়ার মতে, তাঁর অভিনয়ের আসল ভিত তৈরি হয়েছে থিয়েটার থেকেই। চাকরি, নাচ, গান এবং থিয়েটার সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। সপ্তাহের কর্মদিবসে অফিস, আর ছুটির দিনে রিহার্সাল ও শো এভাবেই কেটেছে বহু বছর। এমনকি কথক নৃত্যেরও নিয়মিত চর্চা করতেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে কঠোর অনুশীলনের কোনও বিকল্প নেই। সেই কারণেই আজও নতুন কাজের ক্ষেত্রে নিজেকে ছাত্রীর মতোই মনে করেন।

আরও পড়ুনঃ এপ্রিলে দলে ঢুকলেন, মে মাসে দলটাই উবে গেল! তৃণমূলের সাংসদ পদ ছাড়লেন কোয়েল মল্লিক, কিন্তু মাসে কত টাকা করে পাবেন? বেতন ও ভাতা মিলিয়ে, ‘টলি কুইন’ ঠিক কী কী সুবিধা পেয়েছেন এতদিন? জানলে চোখ উঠবে কপালে!

অভিনয় জগতের পরিবর্তন নিয়েও নিজের মতামত দিয়েছেন অনুসূয়া মজুমদার। তিনি স্মরণ করেছেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তীদের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাঁর কথায়, একসময় শিল্পীদের মধ্যে যে আন্তরিকতা ও একসঙ্গে কাজ করার আনন্দ ছিল, তা আজ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন অনেক নতুন শিল্পী আলাদা মেকআপ রুম বা ব্যক্তিগত পরিসরের উপর বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো তারকারা সকলের সঙ্গে একঘরে বসে গল্প করতে, আড্ডা দিতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। তবে সময়ের পরিবর্তনকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং মনে করেন, যুগের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলাবে, সেটাই স্বাভাবিক। একজন শিল্পীর কাজ হল নিজের কাজটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাওয়া। কোনও অভিযোগ বা অহেতুক অভিমান নয়, বরং পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাই দীর্ঘদিন টিকে থাকার মূলমন্ত্র নিজের জীবন দিয়ে সেই কথাই যেন আরও একবার প্রমাণ করলেন অনুসূয়া মজুমদার।

You cannot copy content of this page