বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র অরিন্দম গাঙ্গুলী। ১৯৬৬ সালে শিশু অভিনেতা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু, ছবির নাম ‘প্রস্তর স্বাক্ষর’। সেখানে তিনি অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর ছোটবেলার চরিত্রে। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। গায়ক, পরিচালক, লেখক ও অভিনেতা—একাধিক পরিচয়ে সমান স্বচ্ছন্দ এই শিল্পী ২০২৬ সালে তাঁর শিল্পজীবনের ৬০ বছর পূর্ণ করছেন। একই সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয় ছবি ‘হংসরাজ’-এরও ৫০ বছর পূর্তি। দীর্ঘ ছয় দশকের পথচলায় তিনি হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
দর্শকদের মনে আজও অমলিন ‘হংসরাজ’-এর হাসিখুশি বাউল ছেলে, যে চরিত্র তাঁকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি এনে দেয়। মহানায়ক উত্তম কুমার-এর সঙ্গে ‘কখনো মেঘ’ ও ‘সাবরমতী’র মতো ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। সৌমিত্রর সঙ্গেও একাধিক স্মরণীয় ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। সঙ্গীত জগতেও তাঁর ছাপ স্পষ্ট—নচিকেতা ঘোষ-এর সুরে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’তে নীলকমলের গান আজও শ্রোতাদের মনে বাজে। ছোটপর্দায় ‘বামাক্ষ্যাপা’ ধারাবাহিকে টানা দশ বছর অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি পরিচালনা করেছেন ‘অগ্নিযুগের কাহিনী’ ও ‘আপর্ণা’ ছবি। মঞ্চে গান, সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র—সব মিলিয়ে তিনি আজও সমান সক্রিয়।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিছক সহ-অভিনেতার নয়, ছিল পারিবারিক স্নেহের। প্রথম ছবিতেই সৌমিত্রর ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করার মাধ্যমে যে ঘনিষ্ঠতা শুরু, তা পরবর্তী সময়ে আরও গভীর হয়। মেগা সিরিয়াল ও টেলিফিল্মে কাজের সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে নানা দিকনির্দেশনা দিতেন। অরিন্দম নিজেই বলেছেন, এটি তাঁর জীবনের এক বিরাট প্রাপ্তি। দার্জিলিংয়ে শুটিংয়ের ফাঁকে উত্তমকুমারের সামনে গান গেয়ে স্নেহ পাওয়ার স্মৃতিও তিনি আবেগ নিয়ে স্মরণ করেন। কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজের সুযোগ তাঁর শিল্পজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে বলেই জানিয়েছেন অভিনেতা।
তবে ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তন তাঁকে ভাবায়। তাঁর কথায়, আগে শিল্পীদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধন—একটি ‘ক্লোজ নিট’ পরিবার। এখন বেড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা ও নিরাপত্তাহীনতা। “আজকাল আমরা এসেই তারকা হয়ে যাই, হোডিংসে মুখ দেখি, আত্মপ্রচারের যুগ চলছে। কিন্তু এতে শিল্পীর দীর্ঘস্থায়িত্ব নষ্ট হয়, প্রদীপের মতো দপ করে জ্বলে নিভে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।” তিনি মনে করেন, চরিত্রের নামে পরিচিত হওয়াই শিল্পীর আসল সাফল্য, শুধু নিজের নামে খ্যাতি দীর্ঘ পথচলা নিশ্চিত করে না।
আরও পড়ুনঃ “তুমি যদি আমার সঙ্গে…তোমার নম্বর বাড়িয়ে দিতে পারি!” শিক্ষকের কু-প্রস্তাবে বলাতেই চরম পরিণতি, বোর্ড পরীক্ষার আগে ‘জরুরি কাজ’-এর নামে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব ও স্কুল জীবনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনলেন কৌশানী মুখার্জী!
শিল্পী সংগঠন নিয়েও তাঁর স্পষ্ট মত। আর্টিস্টস ফোরামে সৌমিত্রর নেতৃত্বে সাত বছর কাজ করলেও পরবর্তীতে আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে সরে আসেন। তাঁর বক্তব্য, সৌমিত্র ও অনুপ কুমারের মতো নেতারা নিজের কথা না ভেবে সবার জন্য লড়তেন, এখন সেই মানসিকতা কমেছে। প্রতিবাদ করলে কাজ পাওয়া কঠিন—এমন বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন তিনি। তবু নিজের নীতি থেকে সরে যাননি। পরিবার তাঁর শক্তি—মা অনুভা গাঙ্গুলির ত্যাগ, ছোটবেলা থেকে গান শেখানো ও সর্বক্ষণ পাশে থাকা তাঁকে গড়ে তুলেছে। আজও বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে মা-বাবাকে প্রণাম করেন। স্ত্রী খেয়ালী দস্তিদারের সঙ্গে তিনি অভিনয় কর্মশালা চালান। দর্শকের ভালোবাসাকেই তিনি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন—যার জোরে ছয় দশক পরেও তিনি প্রাসঙ্গিক।






