রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর টালিগঞ্জে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল প্রযোজকদের সংগঠন ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ইমপা। সোমবার ফল ঘোষণার পর সংগঠনের অফিসে হাজির হন একদল প্রযোজক ও পরিবেশক। সেখানে গেরুয়া আবির খেলায় অংশ নেওয়া হয় বলেও জানা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, অফিসে ঢোকার আগে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি। পরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে অফিস শুদ্ধিকরণের ঘটনাও সামনে আসে। সেই সঙ্গে ওঠে আরও বড় দাবি, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদায় নিয়েছেন, এ বার পিয়া সেনগুপ্তকেও সভাপতির পদ ছাড়তে হবে।”
রাজনৈতিক পালাবদলের পর সাংগঠনিক পালাবদলের দাবিতেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর থেকেই টলিপাড়ার অন্দরে নতুন সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমের প্রশ্নে ইমপা সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত জানান, পীযূষ সাহা, কৃষ্ণা দাগা, রতন সাহা, শতদীপ সাহা-সহ একাধিক প্রযোজক ও পরিবেশক তাঁর পদত্যাগ চাইছেন। তিনি বলেন, নিজের অফিসেই তিনি নিরাপদ বোধ করছেন না। প্রশাসনের সাহায্য নেবেন কি না, সে প্রশ্নে পিয়া জানান, আপাতত বৈঠক চলছে, সেখানে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জানা গিয়েছে, ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে ৪ মে এবং প্রায় দেড় দশক পরে রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে। তার প্রভাব যে টালিগঞ্জের সংগঠনগুলিতেও পড়তে শুরু করেছে, তা এখন স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে স্টুডিয়োপাড়ায় অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের প্রভাব ছিল বলেই অভিযোগ উঠত। নির্বাচনে অরূপ বিশ্বাস পরাজিত হওয়ার পর সেই প্রভাবের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে বলেই দাবি করছেন অনেকে। ফল ঘোষণার পরদিন থেকেই ফেডারেশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কয়েকজন ছোট প্রযোজক। তাঁদের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই ফেডারেশন ও ইমপা-র মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল, যা তাঁরা মানতে চান না।
আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি বৈঠকের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। ফেডারেশন আগে নিয়ম করে দিত, নির্দিষ্ট ছবির শুটিংয়ে তাদের ঠিক করা টেকনিশিয়ানদেরই নিতে হবে। এর ফলে অনেক সময় বাড়তি কর্মী রাখতে হত এবং ছবির বাজেটও বেড়ে যেত বলে অভিযোগ। নিজের পছন্দের টেকনিশিয়ান নিয়োগ করার সুযোগও নাকি অনেক প্রযোজক পেতেন না। বহুদিনের এই ক্ষোভই এখন প্রকাশ্যে আসছে। নতুন পরিস্থিতিতে তাঁদের দাবি, কোনওভাবেই ফেডারেশন যেন ইমপা-কে নিয়ন্ত্রণ না করে। প্রযোজক প্রবীর ভৌমিক বলেন, “এখানে পার্টির রাজত্ব চলছিল।
আমিও তো প্রযোজক, তা হলে প্রযোজকদের বৈঠকে কেন ডাক পাই না? কারণ, এখানে পার্টির মুখ হিসাবে প্রযোজকেরা আসেন। কে বড় প্রযোজক, কে ছোট, সেটা কে ঠিক করবে? আর এ সব মেনে নেব না। সেই দাবি নিয়েই এসেছি।” তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, “এত দিন আমাদের দমিয়ে রাখা হত। আমার ছবি ‘খাঁচা’ ফেডারেশনের নিয়ম মেনে হয়নি বলে ইমপা-কে বারণ করা হয়েছিল এনওসি দিতে। আমি কথা বলতে এলে ১০ লক্ষ টাকা চাওয়া হয় এনওসি দেওয়ার জন্য। ৩ লক্ষ টাকা দিয়েছিলাম। তার পরে সেই ছবি মুক্তি পায়।” অন্যদিকে পরিবেশক শতদীপ সাহা বলেন, “ইমপা-কে অরাজনৈতিক ভাবে, সুস্থ ভাবে চালানোর দাবি নিয়ে এসেছি।
এটাকে যেন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য চালানো হয়।” তিনি আরও বলেন, “সমস্ত সদস্যকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক চাইছি। ইমপা-র বেআইনি ভোট নিয়ে আমাদের অভিযোগ আছে।” শতদীপ আরও বলেন, “আমরা এটাও জানি না যে, স্ক্রিনিং কমিটি আদৌ আছে কি না। অথচ আমি সেই কমিটির সদস্য। সরকার বদলে গেল, তা হলে এই কমিটি থাকবে কি না তাও কেউ জানায়নি। ওঁরা মে মাসের ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে দিয়েছেন। কিন্তু আদৌ সব ছবি আসছে কি? এগুলোর জানানোর দায়িত্ব কার?” ইমপা চেয়ারম্যান ঋতব্রত ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলার একাধিক প্রযোজককে কিছু নিয়মের অজুহাতে বেশি সংখ্যক টেকনিশিয়ান নিতে বাধ্য করা হয়।
আরও পড়ুন: “এবার বিদায় ‘তৃণউড’…” পালাবদলের হওয়া ঋদ্ধি সেনের গায়েও! হঠাৎ মন্তব্যে শোরগোল ফেললেন কৌশিক-পুত্র! টালিগঞ্জে পাপিয়ার জয়, বিজেপি জমানা শুরু হতেই বি’স্ফোরক বার্তা! টলিউড কি এবার রাজনীতির প্রভাবমুক্ত হবে, কী বললেন তিনি?
প্রয়োজনভিত্তিক হলে ভাল হয়। বহুবার বলেও ফেডারেশনকে রাজি করানো যায়নি।” তিনি আরও বলেন, “সরকারে পরিবর্তন এসেছে, এখন অনেকেই স্বচ্ছ, সিন্ডিকেটমুক্ত পরিবেশ চাইছেন।” পরে সংগঠনের কয়েকজন সদস্য বৌবাজার থানায় পিয়া সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। মিলন ভৌমিক জানান, তাঁরা সভাপতিকে বিশ্বাস করেন না, তাই অফিস সিল করার অনুরোধও জানানো হয়েছে। পাল্টা ইমপা-র তরফেও অভিযোগ জমা পড়েছে। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংগঠনের অভিযোগ নেওয়ার পর প্রযোজকদের অভিযোগও গ্রহণ করা হবে।






