বাংলা গানের কথা উঠলে শিল্পি ‘কবীর সুমন’কে (Kabir Suman) অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। তিনি এমন এক নাম, যাঁর উপস্থিতি মানেই আলাদা এক অনুভূতি। বয়সের ক্যালেন্ডারে এবার ৭৭-এ পৌঁছেও তাঁর কণ্ঠে বা ভাবনায় ক্লান্তির কোনও ছাপ নেই। বরং জীবনকে নিয়ে কৌতূহল যেন আগের মতোই অটুট! নিজের জন্মদিনেও সেই একই সুর, জীবন এখনও তাঁর কাছে ভীষণ আগ্রহের, এখনও চারপাশকে নতুন চোখে দেখার মতো অনেক কিছু বাকি আছে।
তাই তাঁর কাছে জন্মদিন কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের দিন নয়, বরং ভাবনা আর কথারও একটি উপলক্ষ। এই বিশেষ দিনে নিজের শহর কলকাতার প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর আবেগ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ছোটবেলা থেকে এই শহরেই বড় হওয়া, এই শহরের পথঘাট, মানুষ আর সংস্কৃতির মাঝেই তাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে। সেই কারণেই কলকাতার প্রতি তাঁর টান আলাদা। এমনকি নিজের জীবনের শেষটাও তিনি এই শহরের মাটিতেই দেখতে চান। শিল্পীর নিজের ভাষায়, “বাংলার মাটিতেই আমায় কবর দেওয়া হোক, এটাই শেষ ইচ্ছে।”
তাঁর কাছে কলকাতা কোনও সাধারণ শহর নয়, বরং জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর অনুভূতির জায়গা। এদিকে, দেশের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর কথায় উঠে এলো ভারতের প্রতি আরও তীব্র ধরনের গভীর ভালোবাসা, তবে সেই ভালোবাসা কেবল ভৌগোলিক সীমানার জন্য নয়! তিনি মনে করেন, ভারতের আসল শক্তি তার বহুত্ববাদী চরিত্র এবং মানুষের মধ্যে থাকা সহাবস্থানের মানসিকতা। এই দেশ কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, ধর্ম বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয় বরং সবার মিলিত সত্ত্বা দিয়েই ভারত গড়ে উঠেছে।
তাঁর বিশ্বাস, সেই উদার মনোভাবই ভারতের প্রকৃত আত্মা। তবে, বর্তমান সময়ের বাস্তবতা নিয়ে তাঁর কিছু অস্বস্তিও রয়েছে। তিনি মনে করেন, যে ভারতকে ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন, তার অনেক কিছুই এখন বদলে গেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বর্তমান ভারতের পরিবর্তিত পরিবেশ নিয়ে নিজের আক্ষেপের কথাও জানান। তাঁর মতে, ছোটবেলায় যে ভারতকে তিনি দেখেছেন, আজকের সময়ে সেই দেশটিকে অনেক সময় আর চিনতে পারেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি দিল্লির কথা মনে করেন।
তখন মানুষ পরস্পরকে খুব স্বাভাবিকভাবে ‘জনাব’ বলে সম্বোধন করতেন এবং পাল্টা জবাবেও একই সম্বোধন শোনা যেত। সেই শব্দটি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের সীমায় আবদ্ধ ছিল না, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষ সহজভাবেই ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখনকার সময়ে ধর্মকে ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা ও অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তাঁকে ভাবায়। তাঁর মনে হয়, এই প্রবণতাই দেশের সেই স্বাভাবিক উদারতা ও মহত্বকে আড়াল করে দিচ্ছে, আর সেই কারণেই বর্তমান সময়ের ভারতকে তিনি আগের মতো ভালোবাসতে পারেন না।
আরও পড়ুনঃ “শিবের উপোস করি, আবার রোজাও রাখি…বগলামুখীর ব্রতও করি…সব ধর্মই আমার,” স্পষ্ট বার্তা, স্বামীহারা সুভদ্রা মুখোপাধ্যায়ের! কেন সব ধর্মের ঈশ্বরকেই একসঙ্গে মানেন তিনি? দর্শকদের উদ্দেশে দিলেন কীসের ইঙ্গিত?
তাঁর কাছে নতুন প্রবণতাগুলি অনেকটাই বিভ্রান্ত আর বুদ্ধিহীন আচরণের দিকে এগোতে দেখছেন। তাঁর কথায়, “বর্তমানে ভারত, হয়ে যাচ্ছে ‘বোকা ভারত’!” প্রসঙ্গত, বাংলা ভাষা নিয়েও তাঁর ভাবনা বরাবরের মতোই স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, এই ভাষা প্রয়োগে অনুভূতি বোঝানো অনেক সহজ। যেমন তাঁর প্রিয় জায়গাকে বোঝানোর জন্য আলাদা কোনও বিশেষণ প্রয়োজন নেই, ‘কলকাতা’ শব্দটাই যথেষ্ট। তাঁর কথায়, সহাবস্থানের সেই পুরনো ধারণা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে, আর সেই জেদই তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন।






