বাংলার বাউল সঙ্গীতের এক অমূল্য রত্ন, কানাই দাস বাউল আর আমাদের মাঝে নেই। বীরভূমের তারাপীঠে শনিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও, তাঁর মৃত্যু সংবাদটি এখনও অনেকের জন্য বিশ্বাস করা কঠিন। একাধারে দৃষ্টিহীন এই বাউল সাধক সংগীতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বসবাস করেছেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা লোকসংগীত এবং বাউল সমাজের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
কানাই দাসের জীবন ছিল সংগ্রাম ও সাধনার প্রতীক। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে মানুষের মধ্যে সত্যের বাণী এবং ভালোবাসার গান ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর কণ্ঠে থাকা সাদাসিধে, হৃদয়গ্রাহী সুরে মানুষকে জীবনের গভীর অর্থ বোঝাতে সাহায্য করেছিল। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘কে বলে মানুষ মরে’- এই গানগুলোর মাধ্যমে তিনি বাউল দর্শন ও মানবতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গীতের রেশ আজও অনেকের মনে জীবন্ত।
কানাই দাস বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন, যার মধ্যে যক্ষ্মা (টিবি), ক্রনিক অ্যাজমা, এবং ডায়াবেটিস ছিল প্রধান। তবে এর মধ্যেও তাঁর গান এবং সাধনা থেমে থাকেনি। সম্প্রতি তিনি কলকাতার একটি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন ছিলেন, এরপর সেখান থেকে নিজ গ্রাম তারাপীঠে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শেষ সময়ে গান গাইতে ভুলেননি, যা তাঁর অন্তরের আলো ও জীবনের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন ছিল।
গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় কানাই দাসের মৃত্যুর খবর শেয়ার করে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কানাইবাবা চলে গিয়েছেন, তবে তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটি ছিল খুবই সহজ ও মধুর। আদরের মানুষগুলো আর কাছে থাকছে না। শেষবার দেখা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “ভাল আমাদের থাকতেই হবে”। তাঁর এই কথা এবং গানের সুর আজও আমাদের হৃদয়ে বাজে’। কানাই দাসের প্রস্থান বাউল সমাজের জন্য এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, যা সহজে পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়।
পান্থ কানাই, এক জনপ্রিয় গায়ক, কানাই দাসের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে লিখেছেন, ‘কানাই দাসের কণ্ঠে ছিল মাটির গন্ধ, তাঁর গানে ছিল মানুষের হৃদয়ের গভীরতা। তাঁর মৃত্যু আমাদের সকলকে গভীর শোকাহত করেছে।’ এই কথাগুলি প্রমাণ করে, কানাই দাস শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে ভালোবাসা ও শান্তির দূত। তাঁর গান কখনোই মৃত হবে না, বরং বেঁচে থাকবে মানুষের মননে।
আরও পড়ুনঃ “শুটিং শেষে কেন সমুদ্রে নামলি? হঠাৎ কী এমন ফুর্তি হলো?” রাহুল অরুণোদয়ের ম’র্মান্তিক মৃ’ত্যু নিয়ে মুখ খুললেন প্রবীণ অভিনেত্রী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়! “যে যার মতো চলছে, বেশি বললে কেউ শুনবে না” নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উদ্দেশ্যে কি বার্তা তাঁর?
কানাই দাসের মৃত্যুর পর তারাপীঠের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। মাটির মানুষ মাটির কোলেই ফিরে গেলেন, কিন্তু তাঁর গান, তাঁর বাণী এবং তাঁর আধ্যাত্মিকতার ধ্বনি থাকবে বাউলদের আখড়ায়, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। কানাই দাসের সুরে বাংলার লোকসংগীত জগতের আরেকটি অধ্যায় শেষ হলো, তবে তাঁর প্রভাব ও প্রেরণা নতুন প্রজন্মকে অবিরত পথ দেখাবে।






