বাংলা অভিনয়ের পরিসরে কিছু নাম রয়েছে, যা সময় পেরিয়েও গেলো আলাদা করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। তাঁদের স্মৃতি শুধু দর্শকের নয়, সহঅভিনেতাদের কাছেও এক গভীর শিক্ষার জায়গা।এমনই এক কিংবদন্তি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনেতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায় উঠে এল এক শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা, বিস্ময় আর ব্যক্তিগত প্রাপ্তির গল্প।
শুভাশিস জানালেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি সিনেমায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অভিনয় দেখে বড় হয়েছেন। পরে হাতিবাগানের বাণিজ্যিক মঞ্চে তাঁকে সরাসরি অভিনয় করতে দেখেন। বিশেষ করে ‘জয় মাকালী বলি’ নাটকের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে শুভাশিস বলেন, সেই সময় ভানুর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। যদিও তখন ব্যক্তিগত পরিচয় হয়নি, কিন্তু মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি গভীর ছাপ ফেলেছিল।
এরপরে একদিন হঠাৎ শ্রাবন্তী মজুমদারের স্টুডিওতে আবার মুখোমুখি হন শুভাশিস ও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন একটি কমেডি নাটকের মহড়া চলছিল। শুভাশিস তখন অভিনয়ে একেবারে নতুন। এমন সময় ভানু এসে জানতে চান, শ্রাবন্তী আছেন কি না। পরে ভিতরে এসে বসে বলেন, তিনি অভিনয়টা দেখতে চান। এই কথা শুনেই শুভাশিসের ভিতরে চাপা উত্তেজনা ও ভয়—কারণ সামনে বসে আছেন কিংবদন্তি অভিনেতা।
দৃশ্যটি ছিল এক রোগী-ডাক্তারের মজার কথোপকথন। শুভাশিস রোগীর চরিত্রে। ডাক্তার তাঁর চোখ টেনে দেখছেন, পেট টিপে দেখছেন, তারপর জিভ বের করতে বলছেন। জিভ দেখার পর ডাক্তার নাম জানতে চান। শুভাশিস স্বাভাবিকভাবেই জিভ ভেতরে নিয়ে নিজের নাম বলেন। ঠিক তখনই অভিনয় থামিয়ে দেন ভানু। তিনি হেসে জিজ্ঞেস করেন, “ডাক্তার তোকে কী করতে বলেছে?” শুভাশিস বলেন, জিভ বার করতে। তখন ভানু খুব সহজভাবে বোঝান—“ডাক্তার তো জিভ বার করতে বলেছে, ভেতরে নিতে তো বলেনি। নাম বলবি জিভ বার করেই।” এরপর তিনি নিজে দেখিয়ে দেন কীভাবে জিভ বের করেই অস্পষ্টভাবে নাম বলতে হবে, যাতে দৃশ্যটা আরও মজার হয়।
শুভাশিস বলেন, ওই ছোট্ট সংশোধনেই তিনি বুঝেছিলেন কমেডির আসল শক্তি কোথায়। সংলাপ শুধু মুখে বললেই হয় না, শরীর, ভঙ্গি আর পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে বলতে হয়। ভানু খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, হাসির মুহূর্ত তৈরি হয় এই সূক্ষ্ম জায়গাগুলো থেকেই। অভিনেতা আরও জানিয়েছেন আমি কোন হরিদাস পাল যে আমাকে তিনি সাহায্য করবেন কিন্তু তিনি একজন এত বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন যে, নবীন শিল্পীকে সময় দিয়ে শেখালেন—এটাই শুভাশিসের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আরও পড়ুনঃ “প্রথম প্রেম আর ঠোঁটে চুমু ভোলা যায় না, নারীর স্পর্শ…” ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র প্রাক্কালে, কিশোর বয়সের স্মৃতিতে ডুব দিলেন ঋজু বিশ্বাস! স্কুল জীবনে সিনিয়র দিদির সঙ্গে প্রথম ঘনি’ষ্ঠতার গল্প বললেন অভিনেতা!
এই ঘটনাকে আজও নিজের অভিনয় জীবনের এক বড় শিক্ষা বলে মনে করেন শুভাশিস। তাঁর কথায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু কৌতুক অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন ভীষণ বড় মাপের শিল্পী। ছোট্ট একটি দৃশ্যের মধ্যেও কীভাবে নিখুঁত টাইমিং ও শরীরী ভাষা দিয়ে দর্শককে হাসানো যায়, তা তিনি হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন।






