মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে একটা পর এক মুরগির ছানা! ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর সেই দৃশ্যের নেপথ্যে মানুষটাকে চেনেন? ফাইট মাস্টার থেকে স্টান্ট ডিরেক্টর, শুধু পর্দায় নয় বাস্তবে লড়েছেন ক্যা’ন্সারের সঙ্গে! বিমল রায়ের জীবন জানলে অবাক হবেন! আজ কোথায় আছেন তিনি?

বাংলা বাণিজ্যিক ছবির দর্শকদের কাছে ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর (Shoshurbari Zindabad) একটি দৃশ্য আজও সমান জনপ্রিয়। নায়ক ও খলনায়কদের তুমুল মারপিটের মাঝে খলচরিত্রের মুখ থেকে গুণে গুণে ১৫ টা মুরগির বাচ্চা বেরিয়ে আসার দৃশ্য সেই সময় দর্শকদের চমকে দিয়েছিল। শুরু কি সেই প্রজন্ম, আজও যে দেখে সেই অবাক হয়ে যায়। কার্যত ছবিটির সঙ্গে দৃশ্যটিও কালজয়ী হয়ে উঠেছে! তবে চেনেন কি, সেই অকল্পনীয় দৃশ্যের প্রাণ দান করেছিলেন যিনি তাঁর নাম? সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফাইট মাস্টার ‘বিমল রায়’ (Bimal Roy)। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় বাংলা ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর আজ তিনি অনেকটাই আড়ালে।

এখন কোথায়, কী করে দিন কাটছে তাঁর? বছর খানেক আগে এক সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের নানান অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেখানে উঠে এসেছে তাঁর সংগ্রাম, অসুস্থতা, আক্ষেপ এবং কাজের প্রতি ভালোবাসার কথা। বহু জনপ্রিয় ছবির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আজকের প্রজন্মের অনেকেই তাঁর বর্তমান অবস্থার খবর জানেন না। সেই কারণেই আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর নাম। কীভাবে এই পেশায় আসা, সেই প্রসঙ্গে বিমল রায় জানিয়েছেন, “এই পেশায় আসার আগে আমি বাচ্চাদের ক্যারাটে শেখাতাম। একদিন আমায় ক্যারাটে শেখাতে দেখেন মুম্বইয়ের এক ফাইট মাস্টার।

তিনি আমাকে প্রস্তাব দেন, সঙ্গে করে নিয়েও যান শুটিংয়ে। সব ব্যবস্থাপনা দেখে তো আমি চমকে গিয়েছিলাম। ভেবেই নিয়েছিলাম, যদি কাজ করি এটাই করব!” এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়, দেব, জিৎ সহ একাধিক তারকার ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত স্মৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর সেই বিখ্যাত দৃশ্য। বিমল রায় জানিয়েছেন, দৃশ্যটি বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৫০টি মুরগির ছানা আনা হয়েছিল। একাধিকবার ছানাগুলো মুখে নিতে এবং বের করতে হয়েছিল তাঁকে।

সেই অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। কারণ, তাঁর কথায় ছানাগুলো ভয় পেয়ে মুখের ভিতরেই মলত্যাগ করে ফেলত, যার ফলে বারবার বমি করতে হয়েছিল তাঁকে। এত কষ্ট করে করা সেই দৃশ্যের জন্য তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৪০০ টাকা। বর্তমানে সেই অঙ্ক খুব কম মনে হলেও সেই সময়ের হিসেবে তা একেবারে নগণ্য ছিল না। তবুও এই দৃশ্যই তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। আরও একটি ঘটনা আজও ভুলতে পারেননি বিমল রায়। চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর ‘জয় বিজয়’ ছবিতে বডি ডাবল হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে।

চিকিৎসার সমস্ত খরচও নিজেকেই বহন করতে হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে তাঁর আক্ষেপ, তখন শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনও শক্তিশালী ব্যবস্থা ছিল না। নিজের পারিশ্রমিক নিয়েও কথা বলতে গিয়ে জানান, “শুরুর দিকে পারিশ্রমিক পেতাম দিনে ১২০ টাকা শেষের দিকে সেটা বেড়ে হয়েছিল ৭ হাজার টাকা।” দীর্ঘ সময় ধরে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত থেকেও ফাইট শিল্পীদের জন্য আলাদা বিমার ব্যবস্থা না থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রসঙ্গত, কর্মজীবনের মাঝেই গলায় ক্যা’ন্সার ধরা পড়ে বিমল রায়ের।

সেই সময়ের কঠিন পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ওই সময়ে কোনও কাজ হাতে ছিল না। ইন্ডাস্ট্রির কেউ খবর নেয়নি। আমার স্ত্রী জ্যোতিষচর্চা করতেন আর বড় ছেলে ছবিতে ফাইটারের কাজ শুরু করেছে। ওই টাকা দিয়েই সংসার চলত। এখন আমি অনেকটাই সুস্থ, তাই এখন বাচ্চাদের ক্যারাটে শেখাই।” অসুস্থতার পর অভিনয় ও ফাইটের কাজ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও তিনি পুরোপুরি থেমে যাননি। বর্তমানে তিনি স্টান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। গত বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবিতেও স্টান্ট ডিরেক্টরের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ ‘ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারের সাফল্যে লাগে সারা জীবন, সেখানে এরা কীভাবে রাতারাতি বিলাসবহুল জীবনের মালিক?’ অফুরন্ত টাকা আর খ্যাতি পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে! নতুন প্রজন্মের সীমাহীন লোভ নিয়ে কী কড়া বার্তা শাস্বতী গুহঠাকুরতার?

নিজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে এখনও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, “এখন কাজ হয় কোথায়? যেটুকু হয় তাতে তেমন ডাক পাই না, তবে ছেলে চুটিয়ে কাজ করছে, এতেই আমি খুশি।” বর্তমানে কাজের সুযোগ কমলেও ছেলের সাফল্যে তিনি আনন্দ খুঁজে পান। বহু স্মৃতি, সাফল্য, কষ্ট আর সংগ্রামকে সঙ্গে নিয়েই এখন নিজের মতো করে জীবন কাটাচ্ছেন বাংলা ছবির এই পরিচিত মুখ। আপনারা শেষ কোন ছবিতে দেখেছেন ওনাকে? অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন!

You cannot copy content of this page