বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী ‘মুনমুন সেন’কে (Moon Moon Sen) নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ বরাবরই ছিল। সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তবে পর্দার বাইরের মুনমুন সেনকে খুব কম মানুষই কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সম্প্রতি সেই অজানা দিক নিয়েই মুখ খুললেন বর্ষীয়ান অভিনেতা ‘অর্জুন চক্রবর্তী’ (Arjun Chakraborty)। বহু বছরের পুরনো একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি এমন এক ঘটনার কথা বলেন, যা শুনে অনেকেই নতুন করে চিনতে শুরু করেছেন মুনমুন সেনকে। তাঁর মতে, গ্ল্যামারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ মানবিক মানুষ। আর সেই স্মৃতিই এখনও ভোলেননি তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর সম্প্রতি উইন্ডোজ প্রোডাকশনের ছবি ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’-এ অভিনয় করেছেন অর্জুন চক্রবর্তী। ছবিতে তাঁর বিপরীতে রয়েছেন রাইমা সেন। সেই সূত্রেই আলোচনায় উঠে আসে রাইমার মা মুনমুন সেনের প্রসঙ্গ। একসময় মুনমুনের সঙ্গে একাধিক ছবি ও ধারাবাহিকে অভিনয় করেছিলেন অর্জুন। এবার মেয়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে পুরনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে তাঁর। সেই স্মৃতি ভাগ করে নিতে গিয়েই তিনি মুনমুন সম্পর্কে বলেন, “মুনমুন ওঁর পিক সময়ে যেমন সুন্দর ছিল, তা যাঁরা দেখেছেন তাঁরাই জানেন। ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালেই চারপাশটা আলো হয়ে যেত… একটা সফ্ট বিউটি। ভীষণ সুন্দরী ছিল মুনমুন। আর মানুষ হিসেবেও ততটা ভাল, উদার। অসম্ভব পড়াশোনা ওঁর। কত বিষয়ে যে মুনমুনের সঙ্গে আড্ডা মারা যায়, ভাবতে পারবেন না। মুনমুন কিন্তু একটা সময় চমৎকার ছবিও আঁকত!”
এরপরই অভিনেতা তুলে ধরেন বহু বছর আগের একটি ঘটনা। তখন ‘আলেয়া’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল টালিগঞ্জে। সেই ধারাবাহিকে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন মুনমুন সেন, অর্জুন চক্রবর্তী এবং মৌলি গাঙ্গুলি। শুটিংয়ের মাঝেই হঠাৎ দেখা যায়, সেটে নেই মুনমুন। তাঁকে খুঁজে না পেয়ে পরিচালক থেকে ইউনিটের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। চারদিকে খোঁজাখুঁজির মধ্যেই অর্জুনের নজরে আসে একটু দূরে একটি রিকশায় বসে রয়েছেন মুনমুন। মুখে ওড়না জড়ানো থাকায় তাঁকে সহজে চেনা যাচ্ছিল না। সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে অর্জুন বলেন, “হঠাৎ করে আমার চোখে পড়ল বেশ খানিকটা দূরে, একটি গাছের ঘন ছায়ায় একটা রিকশার মধ্যে বসে রয়েছে মুনমুন! মুখে ওড়না পেঁচানো, তাই কেউ চট করে চিনতে পারছে না ওকে। আমি তো দেখেই দে ছুট! মুনমুনের কাছে গিয়েই ওকে বললাম, এই কী করছিস? কোথায় যাচ্ছিস? তোকে সবাই গরু খোঁজার মতো খুঁজছে…। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মুনমুন বলল, ‘উঠে এস রিকশায়। চুপচাপ। কোনও কথা বলবে না।’”
মুনমুনের কথামতো রিকশায় উঠে পড়েন অর্জুন। এরপর রিকশাটি টালিগঞ্জ ব্রিজের নিচের একটি এলাকায় গিয়ে থামে, যা তখন যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে পৌঁছে অর্জুন আরও অবাক হয়ে যান। তিনি দেখেন, মুনমুন সেন ওই এলাকার বহু মহিলাকে নাম ধরে ডাকছেন। অভিনেতার কথায়, “রিকশা থেকে নেমেই মুনমুন সেন ওখানকার যৌনকর্মীদের নাম ধরে একে-একে ডাকা শুরু করলেন, ‘এই ছন্দা! এই রূপা! কোথায় রে তোরা?’” কিছুক্ষণের মধ্যেই বহু মহিলা তাঁকে ঘিরে জড়ো হন। তাঁরা সবাই মুনমুনকে অত্যন্ত আপনজনের মতো করে স্বাগত জানান। দৃশ্যটি দেখে বিস্মিত হয়ে যান অর্জুন। কারণ সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে তিনি সম্পূর্ণ অন্য এক ভূমিকায় দেখছিলেন।
সেই জায়গায় গিয়ে অর্জুন জানতে পারেন, মুনমুন সেন নিয়মিতভাবে ওই এলাকার বহু পরিবারের পাশে দাঁড়াতেন। কার সন্তানের স্কুলের ফি বাকি, কার খাতা-কলম দরকার, কার চিকিৎসার প্রয়োজন, সব খবরই তাঁর জানা ছিল। অর্জুন বলেন, “একটু পর দেখলাম মুনমুন নিজের ব্যাগ থেকে মুঠো-মুঠো টাকা বের করছে। ওখানে কার ছেলে-মেয়ের স্কুলের খরচ লাগবে, কার খাতা-পেন্সিলের টাকা চাই, কার মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে হবে, সব নখদর্পণে মুনমুনের। সেই বুঝে ডেকে ডেকে তাদের মায়েদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে ও। ভাবা যায়! আর মুনমুন ওদের দিদি। দিব্যি খোশগল্প চলছে। সেদিন ঘণ্টা দেড়েকের মতো ছিলাম আমরা ওখানে। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।” অভিনেতার মতে, সেই মুহূর্তে তিনি মুনমুন সেনকে একেবারে নতুনভাবে চিনেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ বামপন্থীরা মাঠে নামলেও, টিকি খুঁজে পাওয়া গেল না সায়নী ঘোষের! মধ্যরাতের উচ্ছেদে তছনছ রুটিরুজি, উ’ত্তপ্ত যাদবপুরে কোথায় ছিলেন ঘরের সাংসদ? প্রশ্নের মুখে দায় সারলেন কীভাবে?
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, এই পুরো ঘটনাটি কোনও প্রচারের জন্য করা হয়নি। তখন সামাজিক মাধ্যম বা পাপারাজ্জিদের এত দাপটও ছিল না। ফলে এই সাহায্যের কথা সাধারণ মানুষ জানতেনই না। অর্জুনের কথায়, “মনে রাখবেন, তখন কিন্তু এই পাপরাজ্জি সংস্কৃতি ছিল না। তারকাদের ডেকে ডেকে ছবি তোলানোরও কোনও হিড়িক ছিল না। আর মুনমুন সেসব তো কোনওদিন পরোয়াও করত না। সেদিনও ওই ঘটনার পর শুটিংয়ে ফিরে আর একটি বাক্যও তা নিয়ে খরচ করেনি মুনমুন। ওর কাছে এটা ছিল একদম স্বাভাবিক একটা বিষয়… ফর হার ইট ওয়াজ লাইক ওয়ান ইন দ্য পার্ক। সেই যে মুনমুনকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে চিনলাম, ওঁর সেই রূপটা আজও মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি আমি।” বহু বছর পর এই ঘটনা প্রকাশ্যে এনে অভিনেত্রী মুনমুন সেনের এক অচেনা কিন্তু অত্যন্ত মানবিক মুখের কথা তুলে ধরলেন অর্জুন চক্রবর্তী।






