“বাবা তখন মৃ’ত্যু শয্যায়, সেই সময়ই আমার সংসার ভাঙতে বসে!” কোন কঠিন পরিস্থিতি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল খেয়ালী দস্তিদারকে? ছোট্ট ছেলেকে সামলে, লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতেন! জীবনের কোন অন্ধকার অধ্যায়ের কথা জানালেন অভিনেত্রী?

পর্দার সামনে শিল্পীদের জীবন যতটা রঙিন এবং আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তব জীবন অনেক সময় ততটাই কঠিন ও জটিল হয়ে ওঠে। দর্শকরা তাঁদের অভিনয়, সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার গল্প জানলেও ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই, ভাঙাগড়া এবং মানসিক যন্ত্রণার গল্প অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরিবারকে সামলানোর চাপ কিংবা জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত এসবের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয় শিল্পীদের। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এমনই এক কঠিন অধ্যায়ের কথা তুলে ধরলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী খেয়ালী দস্তিদার।

অভিনয় যেন তাঁর রক্তে মিশে। নাট্যব্যক্তিত্ব পরিবারের মেয়ে খেয়ালী দস্তিদার ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন সংস্কৃতি ও অভিনয়ের আবহে। মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র তিন ক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। দর্শকদের কাছে তিনি শুধু অভিনেত্রী নন, একজন লেখক এবং চিন্তাশীল শিল্পী হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু সাফল্যের এই যাত্রাপথের আড়ালেও ছিল কিছু গভীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, যা তিনি এতদিন খুব বেশি প্রকাশ্যে আনেননি। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে খেয়ালী দস্তিদার জানান, তাঁর প্রথম বিবাহ ভেঙে যাওয়ার সময়টা ছিল জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায়।

পরিচালক দেবাংশু সেনগুপ্তের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তিনি স্বীকার করেন, সম্পর্কের ভাঙন যে অনিবার্য হয়ে উঠছে, তা তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু সেই সত্যিটা মেনে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। আরও কঠিন হয়ে ওঠে পরিস্থিতি, কারণ সেই সময় তাঁর বাবা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং মৃত্যুশয্যায় দিন কাটাচ্ছিলেন। পরিবারের কাছে এই বিচ্ছেদ ছিল বড় ধাক্কা। বিশেষ করে তাঁর বাবা-মা দেবাংশুকে খুবই ভালোবাসতেন। ফলে সম্পর্ক ভাঙার খবর তাঁদের মানসিকভাবে নাড়া দিয়েছিল। খেয়ালীর কথায়, চারপাশ থেকে নানা মন্তব্য, সমালোচনা এবং বিচার শুনতে হলেও তিনি অনেক কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেননি, কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সব সত্যি সকলের সামনে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

এই কঠিন সময়ে তাঁকে সামলাতে হয়েছে নিজের সন্তানকেও। একদিকে পারিবারিক সংকট, অন্যদিকে সমাজের নানা প্রশ্ন সবকিছুর মধ্যে দিয়েই এগোতে হয়েছে তাঁকে। অভিনেত্রী জানান, সম্পর্ক ভাঙার অভিজ্ঞতা ছিল একপ্রকার মানসিক সুনামির মতো। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। পরে অভিনেতা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন তিনি। যদিও সেই পথচলাও একদিনে তৈরি হয়নি। জীবনের নানা ওঠাপড়া, অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস তাঁকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। তাঁর মতে, জীবনে কোনও অধ্যায় শেষ হয়ে গেলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না, বরং নতুন কোনও পথের শুরু হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ শুটিং ফ্লোরে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের অপমানই কি বদলে দিয়েছিল টলিউডের ইতিহাস? এক প্রবীণ অভিনেতার সম্মান রক্ষার লড়াই থেকে কীভাবে তৈরি হয়েছিল আর্টিস্ট ফোরাম? আর সেই অধ্যায়ে কেন বারবার উঠে আসে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম?

সাক্ষাৎকারে খেয়ালী দস্তিদার আরও বলেন, জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সংবেদনশীল এবং পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত জীবনের কষ্ট, সমাজের নানা পরিবর্তন এবং চারপাশের ঘটনাগুলি তাঁর ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিবাদ সবসময় উচ্চস্বরে করতে হয় না; অনেক সময় শিল্প, সাহিত্য বা অভিনয়ের মাধ্যমেও নিজের বক্তব্য তুলে ধরা যায়। জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে আজ তিনি নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। আর সেই কারণেই তাঁর এই গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনি নয়, বরং ভেঙে পড়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণার গল্প।

You cannot copy content of this page