শুটিং ফ্লোরে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের অপমানই কি বদলে দিয়েছিল টলিউডের ইতিহাস? এক প্রবীণ অভিনেতার সম্মান রক্ষার লড়াই থেকে কীভাবে তৈরি হয়েছিল আর্টিস্ট ফোরাম? আর সেই অধ্যায়ে কেন বারবার উঠে আসে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম?

বিনোদন জগৎ মানেই শুধু আলো, ক্যামেরা আর সাফল্যের গল্প নয়। পর্দার আড়ালে শিল্পীদের মধ্যে মতবিরোধ, প্রযোজক-অভিনেতার সংঘাত কিংবা শুটিং ফ্লোরে নানা বিতর্কের ঘটনাও কম শোনা যায় না। অনেক সময় সেই ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে আসে না, আবার কিছু ঘটনা বছরের পর বছর ধরে টলিপাড়ার অন্দরমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে। এমনই একটি ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় এবং সেই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

টলিউডে ‘ব্যাড বয়’ ইমেজ থাকলেও বাস্তবে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় বরাবরই স্পষ্টভাষী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। খলনায়কের চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি বাংলা ছবিকে বারবার সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁর পরিচিতি ছিল যথেষ্ট। তবে এত বড় মাপের একজন শিল্পীকেও একসময় শুটিং ফ্লোরে অপমানিত হতে হয়েছিল বলে জানা যায়।

ঘটনাটি নব্বইয়ের দশকের। তখন বাংলা ছবির অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন নায়ক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং খলনায়ক বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় কলকাতার একটি নামী স্টুডিওতে একটি বড় বাজেটের ছবির শুটিং চলছিল। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন প্রসেনজিৎ, আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। শুটিং চলাকালীন কোনও একটি বিষয় নিয়ে ছবির প্রযোজকের সঙ্গে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের মতবিরোধ তৈরি হয়। প্রথমে কথাকাটাকাটি হলেও পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, সেই সময় প্রযোজক সকলের সামনে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে অপমানজনক কথা বলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে শুটিং সেট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়।

ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। একজন সিনিয়র শিল্পীর কাছে এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই অপমানজনক ছিল। কিন্তু তিনি সেদিন কোনও তর্কে না জড়িয়ে চুপচাপ নিজের মেকআপ রুমে চলে যান। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলেন, মেকআপ তুলে বাড়ি ফিরে যাবেন। এরপর গোটা শুটিং ফ্লোরে শুরু হয় কানাঘুষো। উপস্থিত অনেকেই ঘটনাটি দেখে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। অনেকেরই মনে হয়েছিল, একজন প্রবীণ শিল্পীর সঙ্গে এমন ব্যবহার কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু প্রযোজকের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস তখন খুব কম মানুষেরই ছিল। ফলে অধিকাংশই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকে যান।

তবে সেই সময় শুটিং ফ্লোরে উপস্থিত ছিলেন না প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। পরে ঘটনাটি তাঁর কানে পৌঁছতেই তিনি দ্রুত সেটে চলে আসেন। শুটিং ফ্লোরে পৌঁছে প্রথমেই তিনি বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের মেকআপ রুমে যান। সেখানে গিয়ে তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখতে পান। প্রসেনজিৎ তাঁকে আশ্বস্ত করেন এবং জানান যে বিষয়টি তিনি দেখছেন। এরপর সরাসরি সেই প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলেন প্রসেনজিৎ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, একজন শিল্পীর সঙ্গে এমন আচরণ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিল্পীদের সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। শুধু ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ করেই থেমে থাকেননি তিনি। শিল্পীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ ‘ফিরকি’ নামেই ঘরে ঘরে পেয়েছিলেন পরিচিতি, তারপর হঠাৎই একদিন লাইমলাইট থেকে উধাও! অভিনয় ছেড়ে রাতারাতি কেন দেশ ছাড়েন সম্প্রীতি পোদ্দার? এখন কী করেন অভিনেত্রী? আবার কি কখনও ফিরবেন পর্দায়?

শোনা যায়, সেই ঘটনার পরই শিল্পীদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে আর্টিস্ট ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাতে অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীরা নিজেদের সমস্যা এবং অভিযোগ নির্ভয়ে জানাতে পারেন। প্রসেনজিতের এই পদক্ষেপ সেই সময় ইন্ডাস্ট্রিতে বড় বার্তা দিয়েছিল। তিনি নাকি সেদিন বলেছিলেন, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে অপমান করা মানে গোটা শিল্পী সমাজকেই অপমান করা। পরবর্তীকালে একাধিক সাক্ষাৎকারে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় নিজেই প্রসেনজিতের এই ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, সেই কঠিন সময়ে যেভাবে প্রসেনজিৎ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা তিনি কোনওদিন ভুলতে পারবেন না। আজও টলিউডে এই ঘটনাকে অনেকেই শিল্পীদের মর্যাদা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে মনে করেন। কারণ সেই দিনের প্রতিবাদ শুধু একজন শিল্পীর সম্মান ফিরিয়ে দেয়নি, বরং বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কর্মপরিবেশ নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল অনেককে।

You cannot copy content of this page