আজ ২৮ সেপ্টেম্বর, ৮২ বছরে পা দিলেন বাংলা ছবির অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। ১৯৪৪ সালের এই দিনেই কলকাতার ভবানীপুরের মল্লিক পরিবারে তাঁর জন্ম। পরিবারে তাঁর ডাকনাম ছিল রঞ্জু, তবে পর্দায় রঞ্জিত মল্লিক নামেই তৈরি হয়েছে তাঁর দীর্ঘ পরিচয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আশুতোষ কলেজ এবং শ্যামাপ্রসাদ কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। অভিনয়ে আসার আগে তাঁর জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম, কিন্তু মৃণাল সেনের হাত ধরে বদলে যায় সেই পথ। ১৯৭১ সালে ‘ইন্টারভিউ’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই ছবির জন্য চেকোস্লোভাকিয়ার কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার সম্মান পান তিনি, যা তাঁর অভিনয় জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এরপর আর কি? পেছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
তবে, ‘ইন্টারভিউ’-র পর রঞ্জিত মল্লিক শুধু এক ধরনের ছবিতে নিজেকে আটকে রাখেননি। মৃণাল সেনের ‘কলকাতা ৭১’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘শাখাপ্রশাখা’র মতো ছবিতে কাজ করে তিনি অন্য ধারার অভিনয়ের পরিচয় দেন। আবার ‘মৌচাক’-এর মতো জনপ্রিয় ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করে দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান। ‘মৌচাক’-এ শিতেশ রায়ের চরিত্র তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবেও তাঁর আলাদা জায়গা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’, ‘শত্রু’, ‘নবাব’, ‘ইন্দ্রজিৎ’, ‘বিদ্রোহী’ সহ একের পর এক ছবিতে নানান ধরনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। বিশেষ করে ‘শত্রু’ ছবির পুলিশ আধিকারিকের চরিত্র তাঁর পর্দার পরিচয়কে আরও বদলে দেয়। এরপর প্রতিবাদী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং কঠোর অথচ ন্যায়পরায়ণ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দর্শকের কাছে ‘প্রতিবাদী নায়ক’ হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তবে রঞ্জিত মল্লিকের অভিনয় জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল চরিত্রের বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন হাসির এবং প্রেমের ছবিতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন, অন্যদিকে তেমনই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্রও গ্রহণ করেছেন। ‘স্বয়ংসিদ্ধা’য় মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করা তাঁর কাছে সহজ ছিল না বলেই নিজে জানিয়েছিলেন তিনি। ‘শত্রু’র পুলিশ আধিকারিকের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে বাস্তব পুলিশকর্মীদের চলাফেরা, পোশাক এবং কাজের ধরনও খেয়াল করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, শুধু চরিত্রের পোশাক পরলেই অভিনয় সম্পূর্ণ হয় না, দর্শককে চরিত্রের সঙ্গে ধরে রাখাও জরুরি। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে প্রায় দুই শতকের কাছাকাছি ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে জমেছে। ২০২৩ সালে ‘তারকার মৃত্যু’ দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর বড় পর্দায় ফেরেন এবং ২০২৫ সালের ‘স্বার্থপর’ ছবিতেও অভিনয় করেন, যেখানে তিনি আইনজীবীর চরিত্রে ছিলেন।
পর্দায় রঞ্জিত মল্লিককে বহুবার রাগী, কঠোর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব মানুষ হিসেবে দেখা গেলেও ব্যক্তিজীবনে তাঁর পরিচিতি অনেকটাই আলাদা। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে একাধিক জনপ্রিয় নায়িকার সঙ্গে কাজ করেও তাঁকে ঘিরে নায়িকাদের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন খুব বেশি শোনা যায়নি। মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় থেকে মুনমুন সেন, মিঠু মুখোপাধ্যায়সহ বহু অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। এই প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে রঞ্জিত জানিয়েছিলেন, মহিলাদের তিনি সবসময় বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন। পরিবারের মাসি, জেঠিমাদের জীবন কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাও তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সাহায্য করেছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের অর্থ ছিল, তাই কোনও নায়িকার সঙ্গে কাজের সম্পর্কের বাইরে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করার প্রয়োজন তিনি কখনও অনুভব করেননি। দীপা মল্লিককে বিয়ে করার পর পরিবারকেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রেখেছেন এবং মেয়ে কোয়েল মল্লিকও পরবর্তীতে অভিনয় জগতে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।
রঞ্জিত মল্লিকের ব্যক্তিত্বের আর একটি দিক ধরা পড়ে তাঁর কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও। তিনি জানিয়েছেন, নতুন কোনও ছবিতে কাজ করার আগে গল্প, চিত্রনাট্য এবং পরিচালকের কাজের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। অশালীন বা পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে দেখতে পারবেন না, এমন ছবিতে অভিনয় করতে তিনি আগ্রহী নন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বিভিন্ন বয়সের দর্শকের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, সেই সম্পর্কের মর্যাদা রাখাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আবার বর্তমান বাংলা ছবি নিয়েও তিনি একাধিকবার নিজের মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এখন বাংলা ছবি তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসাও করছে, কিন্তু অনেক ছবিতে আগের মতো বাঙালিয়ানা খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর এই স্পষ্ট কথাবলার স্বভাবই একদিকে যেমন তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে, তেমনই সিনেমার পরিবর্তন নিয়ে তাঁর মন্তব্য নিয়েও সময়ে সময়ে আলোচনা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ “পরজন্ম বলে কিছু থাকলে আমি আর লতা মঙ্গেশকর হতে চাই না!” মৃ’ত্যুর আগে কেন এমন কথা বলেছিলেন কিংবদন্তি গায়িকা? সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল কোন সেই আজীবনের য’ন্ত্রণা? জন্মদিনে ফিরে দেখা সুরসম্রাজ্ঞীর অজানা ক’ষ্টের কথা!
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও রঞ্জিত মল্লিকের পরিচয় শুধু পুরনো দিনের জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ছবির একাধিক প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করে তিনি নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ২০১৪ সালে কলকাতার শেরিফের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি এবং ২০১২ সালে পেয়েছেন বঙ্গবিভূষণ সম্মান। ২০১৭ সালে বাংলা ছবিতে অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি মিঠু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে পুরনো সহকর্মীর কথা স্মরণ করে তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। তাঁর কথায়, ‘মৌচাক’ ও ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র মতো ছবির সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁর যেমন, তেমনই মিঠু মুখোপাধ্যায়েরও। আর এভাবেই নায়ক, প্রতিবাদী চরিত্র, চরিত্রাভিনেতা এবং দীর্ঘদিনের শিল্পী হিসেবে রঞ্জিত মল্লিকের পথচলা আজও বাংলা ছবির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।






