টলিউডের প্রবীণ অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী (Arjun Chakraborty) দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখ। তাঁর সিনেমা জীবনের শুরু হয়েছিল সহকারী পরিচালক হিসেবে। গুলজারের সঙ্গে বহু বছর সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি মৃণাল সেন এবং তপন সিনহার মতো পরিচালকের ছবিতেও অভিনয় করেছেন। বড় পর্দায় তাঁকে শেষ দেখা গিয়েছিল রেশমি মিত্রর ‘ফুলপিসি ভার্সেস এডওয়ার্ড’ ছবিতে। এই ছবির হাত ধরে আবার অভিনয়ে ফিরেছিলেন তিনি। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে নিজের সামাজিক মাধ্যমে বাংলার শিল্পী ও দর্শকদের মানসিকতা নিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই প্রবীণ অভিনেতা।
অর্জুন চক্রবর্তীর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে নিজের সাফল্য প্রমাণ করতে যাওয়াটাই যেন অনেক সময় বোকামির শামিল। তিনি লিখেছেন, যে কোনও ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা বহুদিন ধরে চলে আসছে। তাঁর মতে, বাইরে থেকে আসা কিছু মানুষ অবশ্য এই জায়গায় ভাগ্যবান। বিদেশ থেকে পাওয়া পদক বা সম্মাননা এলেই মাঝে মাঝে মানুষের ঘুম ভাঙে বলে কটাক্ষ করেছেন তিনি। নিজেদের মানুষকে বা অন্য কাউকে সম্মান করতে অনীহা প্রকাশ করাটাও যেন এক ধরনের স্টাইল হয়ে উঠেছে বলে তাঁর অভিযোগ। কীভাবে, কতভাবে অন্যকে অপদস্থ বা ছোট করা যায়, সেটাই যেন মূল শিক্ষার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন অভিনেতা। তবে দক্ষিণ ভারতের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা বলে মনে করেন তিনি এবং সেখানকার তারকাদের প্রতি দর্শকদের ভালোবাসা ও সম্মানের উদাহরণও তুলে ধরেছেন।
অর্জুনের কথায়, দক্ষিণে কোনও তারকা তাঁর সমসাময়িক অন্য বিখ্যাত শিল্পীদের তুলনায় অনেক বেশি সম্মান পান। এই পার্থক্যের কারণ হিসেবে তিনি বাংলার দর্শকদের মধ্যে ‘passion’-এর অভাবের কথা বলেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের মতো একটি জুটি একসময় দর্শকদের আবেগকে শিখরে পৌঁছে দিতে পেরেছিল। কিন্তু তার পর থেকে সাধারণ দর্শকের হৃদয়ে যেন সেই আবেগের পরিবর্তন ঘটেছে। কেন এমনটা হল, কে বা কী এর জন্য দায়ী, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। কোনও বিদেশি শিক্ষা বা রাজনৈতিক দর্শন কি মানুষের অনুভূতি ও আবেগকে গুরুত্বহীন করে দিয়েছে, সেই প্রশ্নও তাঁর পোস্টে উঠে এসেছে। অর্জুন জানিয়েছেন, এই ভাবনাটি বহু বছর ধরে তাঁর আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং এখনও তিনি তার উত্তর খুঁজে চলেছেন।
এরপর নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন প্রবীণ অভিনেতা। একদিন শুটিংয়ের বিরতিতে ফ্লোরের বাইরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বসে গল্প করছিলেন তিনি। সেই সময় মুম্বই থেকে আসা এক অভিনেতা সেখানে হাজির হন। অর্জুনের ভাষায়, সেই অভিনেতার সঙ্গে প্রায় কুড়িজনের মতো মানুষ তাঁকে ঘিরে ছিলেন। অথচ মুহূর্তের মধ্যে সবাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ভুলে গিয়ে মুম্বই থেকে আসা সেই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেছিলেন। অর্জুন এবং সৌমিত্র চুপ করে বসে থাকলেও কেউ এসে তাঁদের সঙ্গে ওই অভিনেতার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। এমনকী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় বা গুরুত্ব সম্পর্কেও তাঁকে কেউ কিছু বলেননি, আর ঘটনাটি তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন অর্জুন।
দক্ষিণ ভারতের দর্শকদের তারকাদের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার তুলনাও করেছেন তিনি। অর্জুন উদাহরণ হিসেবে তামিলনাড়ুর কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সেখানে কেউ যদি রজনীকান্তের ছবির প্রথম দিনের প্রথম শোর টিকিট হাতে নিয়ে যান, তাহলে যে কোনও ট্যাক্সি বা অটোচালক তাঁকে বিনা পয়সায় সিনেমা হলে পৌঁছে দিতে পারেন। একজন অভিনেতার প্রতি মানুষের এমন টান এবং সম্মানই তাঁকে ভাবায় বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সেখানে তারকা এবং দর্শকের সম্পর্কের মধ্যে যে আবেগ দেখা যায়, সেটি বাংলায় কোথায় হারিয়ে গেল, সেটাই তাঁর কৌতূহলের বিষয়। তবে কারও ছোট না করে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চান বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর পোস্টের মূল বক্তব্য শুধু বাংলা সিনেমার সমালোচনা নয়, বরং শিল্পী এবং দর্শকের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই আবেগের জায়গাটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা।
আরও পড়ুনঃ “গাড়িতে তেল নেই, হঠাৎ প্রচুর টাকা চায়, না দিতেই ব্যাগসহ আমাকে টেনে হিঁচড়ে…কাল বাঁচতাম না” “বিপদে সাহায্য চেয়েও যদি না পান, এই শহরে নিরাপত্তা কোথায়?” সেফটি হেল্পলাইনের অসহযোগিতা, বাধ্য হয়েই করলেন এফাইয়ার! মধ্যরাতের লাইভের পর, ফের ভিডিওতে র্যাপিডো চালকের ভয়ংকর পরিকল্পনা ফাঁস করে অ্যাপ ব্যানের দাবি সম্পিতা প্রামাণিকের! ঠিক কী হয়েছিল শুনলে গায়ে কাঁটা দেবে?
সবশেষে অর্জুন চক্রবর্তীর এই দীর্ঘ বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলা বিনোদন জগতের প্রতি তাঁর গভীর অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ। নিজের কর্মজীবনে গুলজার, মৃণাল সেন, তপন সিনহার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সেই জায়গা থেকেই হয়তো শিল্পীকে সম্মান করার সংস্কৃতি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। একদিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিকে উপেক্ষা করার ঘটনা তাঁকে আঘাত করেছিল। অন্যদিকে রজনীকান্তকে ঘিরে দক্ষিণ ভারতের দর্শকদের উন্মাদনা তাঁকে একইসঙ্গে বিস্মিত করেছে। এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে তুলনা টেনেই বাংলার দর্শকদের আবেগ ও শিল্পীদের প্রতি সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর এই দীর্ঘ পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর বাংলা সিনেমা এবং তারকাদের নিয়ে দর্শকদের মানসিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।






