বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমারের জায়গা যে কতটা আলাদা, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলা। তাঁর শেষযাত্রায় রাস্তায় নেমে এসেছিল বিপুল সংখ্যক মানুষ, প্রিয় নায়ককে শেষবারের মতো দেখতে। সেই শোকের আবহে বাংলা ছবির বহু পরিচিত মুখও উপস্থিত ছিলেন মহানায়কের শেষযাত্রায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকও, যাঁর সঙ্গে উত্তম কুমারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ‘মৌচাক’ দিয়ে শুরু করে একাধিক ছবিতে তাঁরা একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। পরে রঞ্জিত নিজেই জানিয়েছিলেন, উত্তম কুমার তাঁর কাছে শুধু সহঅভিনেতা ছিলেন না, দাদার মতোই ছিলেন। কিন্তু তাঁর শেষ যাত্রায় কীভাবে জড়ালের বিতর্কে?
উত্তম কুমারের সঙ্গে প্রথম কাজের সময় স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। তবে শুটিং শুরু হওয়ার পর সেই অস্বস্তি খুব দ্রুত কেটে যায় বলে একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। ‘মৌচাক’ থেকে শুরু করে আরও কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন দু’জনে। এমনকি নিজের শট না থাকলেও উত্তম কুমারের অভিনয় দেখার জন্য সেটে বসে থাকতেন রঞ্জিত। মহানায়কের কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অভিনয়ের ধরন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। রঞ্জিতের স্মৃতিতে উত্তম কুমার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সেটে তাঁকে আপন দাদার মতো আগলে রেখেছিলেন। তাই মহানায়কের আকস্মিক মৃত্যু তাঁর কাছেও যে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল, পরবর্তী নানান স্মৃতিচারণে তার ইঙ্গিত মিলেছে।
কিন্তু উত্তম কুমারের শেষযাত্রার একটি দৃশ্যই পরবর্তীকালে রঞ্জিত মল্লিককে ঘিরে তৈরি করে প্রবল বিতর্ক। মহানায়কের শববাহী গাড়িতে তাঁর নিথর দেহের পাশে বসেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক। সেই সময়কার কিছু স্টিল ছবি ও ভিডিওতে তাঁর মুখে আচমকা এক গাল হাসি দেখা যায়। শোকের সেই ভারী পরিবেশে এমন হাসিমুখের ছবি স্বাভাবিকভাবেই অনেকের চোখে বেমানান লেগেছিল। মহানায়কের শেষযাত্রার মতো আবেগঘন মুহূর্তে কীভাবে কারও মুখে এমন হাসি ফুটে উঠতে পারে, তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সেই সময় এই ছবি ঘিরে রঞ্জিত মল্লিককে যথেষ্ট সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল। প্রিয় সহকর্মী এবং দাদার মতো মানুষকে হারানোর মুহূর্তে তাঁর মুখের সেই হাসির ব্যাখ্যা নিয়েই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীকালে রঞ্জিত মল্লিক এই হাসির পিছনে নিজের ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন বলে সেই সময়ের আলোচনা থেকে জানা যায়। তাঁর বক্তব্য ছিল, সেখানে উপস্থিত কোনও পরিচিত মানুষের সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হয়েছিল। সেই মুহূর্তের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াতেই তাঁর মুখে হাসি চলে এসেছিল বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাও সকলের প্রশ্নের অবসান ঘটাতে পারেনি। কারণ যে পরিবেশে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেখানে উত্তম কুমারের নিথর দেহ একেবারে সামনে ছিল। ফলে অনেকের কাছেই বিষয়টি আবেগের সঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কীভাবে এমন শোকের মুহূর্তেও একজন মানুষের মুখে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠতে পারে, সেই প্রশ্নই তখন রঞ্জিত মল্লিককে ঘিরে নিন্দার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুনঃ “পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও ক্ষেত্রেই নিজের সাফল্য প্রমাণ করতে যাওয়া বোকামি”, “পরকে অপদস্থ করাটাই এখানে মূল শিক্ষার, স্টাইল!” “মুম্বাইয়ের ওই অতি নিম্ন মানের অভিনেতা যেদিন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিকে ছোট করেছিল, সেদিনই বুঝেছি…” বিদেশের পদক বা ফলকেই শুধু ঘুম ভাঙ্গে, বাঙালিদের মানসিকতা নিয়ে বি*স্ফোরক অর্জুন চক্রবর্তী ফাঁস করলেন কোন ঘটনা?
তবে আজ এত বছর পর সেই পুরনো মুহূর্তের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও একটি দিক থেকে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের শোক প্রকাশের ধরন সবসময় একরকম হয় না এবং ক্যামেরায় ধরা একটি মুহূর্তও সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বোঝাতে পারে না। তবু উত্তম কুমারের মতো একজন কিংবদন্তির শেষযাত্রার সেই দৃশ্য দর্শকদের মনে আলাদা ছাপ ফেলেছিল। কারণ মহানায়কের সঙ্গে রঞ্জিত মল্লিকের সম্পর্ক যে কেবল পেশাগত ছিল না, তাঁর নিজের স্মৃতিচারণেই তার প্রমাণ রয়েছে। ২০২৬ সালে উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষেও রঞ্জিত মল্লিক তাঁর সঙ্গে কাজের নানা স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন। তাই এত বছর পরেও সেই শেষযাত্রার হাসিমুখের ছবিটি সামনে এলে পুরনো প্রশ্নটি ফিরে আসে। উত্তম কুমারের শেষযাত্রায় রঞ্জিত মল্লিকের মুখে দেখা সেই এক ঝলক হাসি কি সত্যিই নিছক পরিচিত কারও সঙ্গে চোখাচোখির প্রতিক্রিয়া ছিল, নাকি শোকের মুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়া এক অস্বাভাবিক মানবিক মুহূর্ত?






