নৃত্যশিল্পী, অভিনেত্রী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত মুখ মমতা শঙ্কর। অভিনয় ও নাচের জগতে তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের নানা বিষয় নিয়ে স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করতেও তাঁকে বহুবার দেখা গিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা এবং মানবিকতার মতো বিষয় নিয়ে তিনি বরাবরই সরব। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান সমাজের নানা পরিবর্তন, তরুণ প্রজন্মের জীবনযাপন, শিক্ষা ও ধর্মের প্রকৃত অর্থ এবং স্কুল-কলেজে কনডম পাওয়া নিয়ে চলা বিতর্ক প্রসঙ্গে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে যেমন উঠে এসেছে উদ্বেগ, তেমনই উঠে এসেছে সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তাও।
সাক্ষাৎকারে শিক্ষা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মমতা শঙ্কর বলেন, আজকাল অনেকেই মনে করেন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু তাঁর মতে, শিক্ষার আসল অর্থ আরও অনেক গভীর। তিনি বলেন, শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবই পড়া বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়, বরং একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে স্কুল-কলেজে কনডম পাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী সরাসরি মন্তব্য করতে খুব একটা আগ্রহী না হলেও বিষয়টিকে অত্যন্ত কুরুচিকর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলতেও তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে সমাজে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, যদি মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধের শিক্ষা না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাজকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারে না।
ধর্ম নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মমতা শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, পৃথিবীর কোনও ধর্মই মানুষকে খারাপ হতে শেখায় না বা অন্যের উপর অত্যাচার করতে বলে না। বরং প্রত্যেক ধর্মের মূল শিক্ষা হল মানবতা, সহমর্মিতা এবং ভালোবাসা। তিনি মনে করেন, ধর্মের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় যখন তার ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। বিশেষ করে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা ও অপব্যাখ্যার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অভিনেত্রীর মতে, সনাতন ধর্ম অত্যন্ত উদার এবং সকলকে আপন করে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। একইভাবে অন্যান্য ধর্মও মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে চায়। তাই ধর্মকে বিভেদ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে মানুষের মধ্যে সংযোগ ও সম্প্রীতির মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর কথায়, “যে ধর্ম মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে, সেটাই প্রকৃত ধর্ম।”
আরও পড়ুনঃ “অমিতাভ বচ্চন দিদির এক ডাকে সপরিবারে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আসতেন.. সেখানে মাত্র একটা সিনেমা!”, “দু’বছরেও দুর্নীতি বুঝলেন না, ভোটের ফলের পরই সব ধরা পড়ল?” রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটা’ক্ষ তৃণমূলী দম্পতি অর্ণব-ময়নার
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে বর্তমান প্রজন্মের অনেকের দ্রুত সাফল্য, জনপ্রিয়তা এবং আর্থিক উন্নতি নিয়েও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন মমতা শঙ্কর। তিনি বলেন, নাম, যশ, অর্থ কিংবা সামাজিক মর্যাদা জীবনের স্থায়ী পরিচয় নয়। এগুলো সময়ের সঙ্গে আসে এবং একদিন চলে যায়। নিজের পরিবারের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, বিখ্যাত পরিবারে জন্মালেও তাঁর বাবা-মা কখনও তাঁকে সেই পরিচয়ের অহংকার করতে শেখাননি। বরং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন এবং নম্রতা বজায় রাখার শিক্ষাই দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষ হিসেবে নিজের মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং আচরণই একজনের প্রকৃত পরিচয়। তাই বাহ্যিক সাফল্যকে আঁকড়ে না ধরে জীবনের আসল অর্থ খুঁজে নেওয়া উচিত। সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম ও মানবিকতা নিয়ে তাঁর এই মন্তব্যগুলি নতুন করে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে এবং বর্তমান সময়ে মূল্যবোধের গুরুত্বকেই আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে।






