“অমিতাভ বচ্চন দিদির এক ডাকে সপরিবারে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আসতেন.. সেখানে মাত্র একটা সিনেমা!”, “দু’বছরেও দুর্নীতি বুঝলেন না, ভোটের ফলের পরই সব ধরা পড়ল?” রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটা’ক্ষ তৃণমূলী দম্পতি অর্ণব-ময়নার

গত কয়েকদিন ধরে অভিনেত্রী ও সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে বাংলা বিনোদন জগতেও জোর চর্চা চলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, নির্বাচনে তাঁর জয়ের নেপথ্যের কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব এবং ‘যোগ্যতা’ নিয়ে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিশেষ করে তাঁর দাবি যে তিনি শুধুমাত্র দলের প্রতীক বা মুখের জোরে জেতেননি এবং তৃণমূলের ভিতরে থাকা নানা সমস্যার কথা তিনি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন, সেই বক্তব্যকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি এবার এই বিতর্কে মুখ খুলেছেন বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় দম্পতি অভিনেতা অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিনেত্রী ময়না বন্দ্যোপাধ্যায়। এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

বাংলা মেগা সিরিয়ালের পরিচিত মুখ অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই ছোটপর্দার দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে এবং তৃণমূল যুব কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ময়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। রচনার সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রসঙ্গে অর্ণব বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অত্যন্ত সম্মান করেন এবং তাঁর অভিনয় জীবনের সাফল্যকে শ্রদ্ধা করেন। তবে ২০২৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০২৬ সালে এসে দলের মধ্যে দুর্নীতি দেখতে পাওয়ার দাবি তাঁর কাছে যথেষ্ট বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। অর্ণবের প্রশ্ন, যদি সত্যিই এত বড় সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে তা বুঝতে দু’বছর সময় লাগল কেন? তাঁর মতে, একজন সাংসদ হিসেবে এতদিন দলের সঙ্গে থাকার পর হঠাৎ করে এমন উপলব্ধি হওয়া সাধারণ মানুষের কাছেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। ময়নাও একই সুরে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পরই যদি দলের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে সেই অভিযোগের সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরবানা’ সংক্রান্ত মন্তব্যও এই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অভিনেত্রীর বক্তব্য ছিল, আরবানার মতো আবাসনে থাকতে গেলে একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। এই মন্তব্যের জবাবে অর্ণব বলেন, কোনও আবাসনে থাকা বা নির্দিষ্ট জীবনযাত্রা কখনও মানুষের যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূল কংগ্রেস নিজেকে ‘মা-মাটি-মানুষের’ দল হিসেবে পরিচয় দেয় এবং সেই দর্শনের মূল ভিত্তি হল সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা। তিনি বলেন, মাটির কাছাকাছি থাকা, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া এবং দুস্থ ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁদের কাছে প্রকৃত যোগ্যতা। ময়নাও এই মন্তব্যের সমর্থন করে বলেন, কোনও আবাসন, আর্থিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয়কে মানুষের মান নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁদের মতে, মানুষের কাজ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।

রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও দাবি করেছিলেন যে তিনি শুধুমাত্র তৃণমূলের প্রতীক বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখের জোরে জয়ী হননি, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে অর্ণব বলেন, রচনা যে একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন এবং বাংলা বিনোদন জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। তবে একই সঙ্গে অর্ণবের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তাকে অস্বীকার করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি নিজেই একটি ব্র্যান্ড। কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন থেকে শুরু করে রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অর্ণব আরও বলেন, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করেছেন, এটি অবশ্যই তাঁর অভিনয় জীবনের বড় অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা উচিত যে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো অনুষ্ঠানে বহুবার অমিতাভ বচ্চন ও তাঁর পরিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে উপস্থিত থেকেছেন। তাই দুই ক্ষেত্রকে তুলনা করে দেখার কোনও প্রয়োজন তিনি মনে করেন না।

আরও পড়ুনঃ ফের নক্ষত্র পতন! না ফেরার দেশে কিংবদন্তি নাট্যকার, পরিচালক! শোকে স্তব্ধ নাট্য ও চলচ্চিত্র মহল

সাক্ষাৎকারে রচনার সেই অভিযোগেরও জবাব দেন অর্ণব, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে বহুবার বিভিন্ন অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেগুলি গুরুত্ব দেননি। অর্ণব বলেন, অভিযোগ করা এবং সেই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাঁর মতে, কোনও ব্যক্তি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করলেই তা সত্য প্রমাণিত হয় না। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, বর্তমানে অনেকেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে অজুহাতকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ময়নাও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, অভিযোগের যথার্থতা বিচার করতে হলে তার সমর্থনে তথ্য ও প্রমাণ থাকা জরুরি। সব মিলিয়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে অর্ণব ও ময়না বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে তৃণমূল নেতৃত্ব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে যেমন রচনার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই উঠে এসেছে দল, নেতৃত্ব এবং জনসংযোগের রাজনীতি নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ।

You cannot copy content of this page