“ও যথেষ্ট ভালো ছিল, কার্তিকের থেকেও বেশি সুদর্শন…মহিষাসুরকে খারাপ বলব কেন?” “চাইলেই ক্ষমা করে দেওয়া যেত, কিন্তু অ’স্ত্রের প্রয়োগ করলেন মা দুর্গা!” চিরচেনা অসুরবধের কাহিনি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শিলাজিৎ মজুমদার? প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কেন এমন অদ্ভুত ভাবনা? গায়কের মন্তব্যে শুরু চর্চা!

দুর্গাপুজো মানেই মা দুর্গার অসুরবধের কাহিনি, আর সেই কাহিনিতে মহিষাসুরকে সাধারণত অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু এই পরিচিত ধারণার বাইরে গিয়ে মহিষাসুরকে নিয়ে একেবারে অন্যরকম ভাবনা প্রকাশ করলেন গায়ক ও অভিনেতা শিলাজিৎ মজুমদার। তাঁর চোখে মহিষাসুর শুধু খারাপের প্রতীক নন, বরং এমন এক চরিত্র, যাঁর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ভালো গুণও। ছোটবেলা থেকে মহিষাসুরের কথা শুনে তাঁর মনে ভয় বা ঘৃণার বদলে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের আকর্ষণ। এমনকি দেবতা কার্তিকের সৌন্দর্য নিয়ে যত আলোচনা হয়, শিলাজিতের মতে মহিষাসুরও রূপের দিক থেকে কোনও অংশে কম নন। নিজের সঙ্গে মহিষাসুরের তুলনা টেনেও মজার ছলে তিনি জানিয়েছেন, দু’জনেই বেশ সুদর্শন। তাঁর এই অন্যরকম ভাবনাই এখন আলোচনায় উঠে এসেছে।

শিলাজিতের কথায়, ছোটবেলা থেকেই মহিষাসুরকে খারাপ চরিত্র হিসেবেই চিনেছেন তিনি। তাঁকে শেখানো হয়েছিল, মহিষাসুর অন্যায় করেছেন বলেই দেবী দুর্গার হাতে তাঁর বধ হয়েছিল। সেই কারণে মহিষাসুরকে ঘিরে প্রচলিত ধারণাও তাঁর কাছে অজানা ছিল না। তবে দুর্গাপ্রতিমার দিকে তাকালে মহিষাসুরকে কখনও আলাদা করে বাদ দেওয়া যায় না, এই বিষয়টিও তাঁর মনে প্রভাব ফেলেছিল। শিলাজিতের বক্তব্য, ছোটবেলায় মহিষাসুরকে দেখে যতটা ভয় পাওয়ার কথা, তাঁর ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। বরং চরিত্রটির প্রতি একটা আলাদা ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাবনা আরও বদলেছে। এখন তিনি মনে করেন, কোনও চরিত্রকে শুধুমাত্র তার খারাপ কাজ দিয়ে বিচার করলে তার অন্য দিকগুলো চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। মহিষাসুরকে নিয়েও তাঁর ভাবনা অনেকটাই সেই জায়গা থেকে তৈরি।

মহিষাসুরকে নিয়ে নিজের ভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিলাজিৎ মানুষের স্বভাবের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ভালো এবং খারাপ, দুই দিকই থাকে। বাইরে থেকে কাউকে দেখে তাঁর আচরণকে অশুভ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার মানেই সেই মানুষটির মধ্যে ভালো কিছু নেই, এমনটা বলা যায় না। অনেকেই নিজের নেতিবাচক দিককে নিয়ন্ত্রণে রেখে জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তাই কাউকে এক কথায় ভালো বা খারাপ বলে চিহ্নিত করা তাঁর পছন্দ নয়। মহিষাসুরের ক্ষেত্রেও একইভাবে ভাবেন শিলাজিৎ। তাঁর মতে, অসুরের মধ্যে যেমন খারাপ দিক ছিল, তেমনই কিছু গুণও ছিল, যা অস্বীকার করা যায় না। এমনকি কাহিনির শেষদিকে মহিষাসুর ক্ষমা চেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। সেই জায়গা থেকেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, মহিষাসুরকে কি ক্ষমা করে দেওয়া সম্ভব ছিল না?

ছোটবেলায় মহিষাসুরের বধকেই সঠিক বলে মনে হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিলাজিতের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। তাঁর মনে হয়েছে, মা দুর্গার হাতে যখন এত অস্ত্র ছিল, তখন অসুরকে বধ করার আগে অন্য কোনও পথ বেছে নেওয়া যেত কি না, সেই প্রশ্নও করা যায়। শিলাজিতের মতে, দেবী চাইলে মহিষাসুরের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারতেন। তিনি মজার ছলে বলেছেন, অস্ত্রের পাশাপাশি ‘মগজাস্ত্র’ প্রয়োগ করেও অসুরকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল। সেই চেষ্টা সফল হলে হয়তো মহিষাসুর নিজের ভুল বুঝে ফিরে যেতেন। তাঁর এই বক্তব্যে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিকে অস্বীকার করার চেয়ে বরং অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা রয়েছে। শিলাজিতের মতে, শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি কাউকে বোঝানোর চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মহিষাসুরের কাহিনি নিয়ে তাঁর এই প্রশ্নই তাঁর ভাবনার মূল জায়গা।

শিলাজিতের চোখে মহিষাসুরের কয়েকটি গুণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, মহিষাসুর ক্ষমা চাইতে জানতেন, আবার দীর্ঘ সময় ধরে তপস্যা করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। কোনও লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য তাঁর ধৈর্য এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাও কম ছিল না। এই গুণগুলির কারণেই মহিষাসুরকে হেলাফেলা করার মতো চরিত্র বলে মনে করেন না গায়ক। তাঁর মতে, কোনও চরিত্রের নেতিবাচক দিকের পাশাপাশি ইতিবাচক দিকগুলিও দেখা প্রয়োজন। মহিষাসুরের মধ্যে থাকা এই গুণগুলি নিয়েই নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যে পৌরাণিক চরিত্রটিকে একমাত্রিকভাবে বিচার না করে তার নানা দিক বুঝে নেওয়ার কথা উঠে এসেছে। ফলে মহিষাসুরের পরিচিত কাহিনিকে শিলাজিৎ নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।

আরও পড়ুনঃ “উত্তম কুমারের সঙ্গে ছবি করার কথা ছিল, একের পর এক ধাক্কায় সব ওলটপালট…দিদির জীবনে এত ক’ষ্ট সহ্য করতে পারবেন না!” “কাজে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ওই ঘটনার পর দিদি আগের মতো ছিল না” মিঠু মুখোপাধ্যায়ের স্মরণসভায় কেঁদে ফেললেন দুই বোন, জানালেন ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র পর কেন অভিনয়জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন অভিনেত্রী? নেপথ্যে ছিল ব্যক্তিগত আ’ঘাতের গল্প?

মহিষাসুরের রূপ নিয়েও শিলাজিতের বক্তব্য বেশ মজার। তাঁর মতে, কার্তিকের সৌন্দর্য নিয়ে অনেক প্রশংসা হলেও মহিষাসুরও কম সুদর্শন নন। নিজের সঙ্গে মহিষাসুরের তুলনা টেনে তিনি বলেছেন, দু’জনেই বেশ হ্যান্ডসাম। শুধু তাই নয়, সময়ের সঙ্গে মহিষাসুরের রূপ যেন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে বলেও রসিকতা করেছেন তিনি। বিজয়া দশমীর প্রসঙ্গ টেনে শিলাজিৎ মনে করিয়ে দিয়েছেন, সেই দিন মহিষাসুরের মুখেও মিষ্টি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, যাঁকে দুর্গাপুজোর কাহিনিতে পরাজিত অসুর হিসেবে দেখা হয়, তাঁকেও পুজোর নানা রীতির মধ্যে জায়গা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মহিষাসুরকে নিয়ে শিলাজিতের এই ভাবনায় রয়েছে রসিকতা, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং পরিচিত কাহিনিকে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা। তাঁর মতে, মহিষাসুরকে শুধু খল চরিত্র হিসেবে না দেখে তাঁর অন্য দিকগুলিও বোঝা দরকার।

You cannot copy content of this page