মহুয়া রায়চৌধুরী নামটি আজও বাঙালি দর্শকের কাছে বিশেষ আবেগের। সত্তর ও আশির দশকে টালিগঞ্জের অন্যতম ব্যস্ত এবং জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন তিনি। সেই সময় অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় এবং সন্ধ্যা রায়ের মতো অভিনেত্রীরাও বাংলা ছবিতে দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। তার মধ্যেই নিজের অভিনয় এবং পর্দার উপস্থিতি দিয়ে আলাদা জায়গা তৈরি করে নেন মহুয়া। মাত্র ১২ বছরের অভিনয় জীবনে একের পর এক মনে রাখার মতো ছবি উপহার দেন তিনি। কিন্তু ১৯৮৫ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তাঁর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু বাংলা ছবিতে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। মৃত্যুর ৪১ বছর পরেও সেই ঘটনার আসল কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, আর তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি এখনও দর্শকের স্মৃতিতে একই রকম উজ্জ্বল।
মহুয়ার আসল নাম ছিল শিপ্রা রায়চৌধুরী, ১৯৫৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দমদমে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী ছিলেন নৃত্যশিল্পী এবং উদয়শঙ্করের কাছে নাচ শিখেছিলেন। বাবার কাছ থেকেই ছোটবেলা থেকে নাচের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় শিপ্রার। মাত্র সাত বছর বয়সে মঞ্চে নাচ করে দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি এবং তখন তাঁর মঞ্চনাম ছিল সোনালি রায়। এরপর কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন মঞ্চে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন তিনি। বাবার টালিগঞ্জে কিছু পরিচিতি থাকায় অভিনয়ের সুযোগও সামনে আসে। ‘নয়া মিছিল’ ছবির জন্য তাঁকে পছন্দ করেছিলেন প্রযোজক সুখেন দাস, কিন্তু পরিচালক পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের মনে হয়েছিল রোগা সোনালিকে সেই চরিত্রে মানাবে না। ঠিক সেই সময়েই তরুণ মজুমদারের নতুন ছবির জন্য অল্পবয়সি মুখের খোঁজের খবর পান তিনি।
কনে সাজিয়ে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া শিপ্রা ওরফে সোনালিকে তরুণ মজুমদারের সামনে নিয়ে আসা হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বা ১৪ বছর। ১৯৭৩ সালে ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির মাধ্যমে সেই কিশোরীর বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে। সিনেমার জগতে তাঁর সাধারণ নামের বদলে পরিচালকই নতুন নাম ঠিক করেন, মহুয়া। অভিনয়ের শুরুতে তাঁকে নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন সন্ধ্যা রায়। স্নেহের সঙ্গে অভিনয়ের নানা দিক বুঝিয়েছিলেন তিনি এবং মহুয়ার প্রতিভা খুব দ্রুতই প্রকাশ্যে আসে। সন্ধ্যা রায় পরে বলেছিলেন, তাঁকে আসলে বেশি কিছু শেখাতে হয়নি, শুধু অভিনয়ের অংশটি বুঝিয়ে দেওয়ার পর মহুয়া নিজের মতো করে খুব সহজেই তা করে ফেলতেন। প্রথম ছবিই সাফল্য পায় এবং এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭৫ সালে পীযূষ বসু পরিচালিত ‘বাঘ বন্দী খেলা’য় উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে অভিনয় করেন মহুয়া, পরে ‘সেই চোখ’ ছবিতেও মহানায়কের সঙ্গে দেখা যায় তাঁকে।
অভিনয়ের পাশাপাশি মহুয়ার ব্যক্তিগত জীবনেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তিলক চক্রবর্তীর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং তিলকও ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অল্প বয়সেই তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। মহুয়ার পরামর্শেই নাকি তিলক অনিশ্চিত অভিনয়জীবন ছেড়ে ব্যাঙ্কে চাকরি শুরু করেছিলেন। এরপর দুজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও দুই পরিবারের কর্তারাই সেই সম্পর্কে আপত্তি জানান। তৎকালীন শিল্পীদের মধ্যে এমন কথাও শোনা গিয়েছিল যে, মহুয়ার বাবা হয়তো মেয়ের জনপ্রিয় অভিনয়জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারকে না জানিয়েই পালিয়ে বিয়ে করেন মহুয়া ও তিলক। এই বিয়ের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন মহুয়ার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রত্না ঘোষাল এবং বিয়ের উদ্যাপন হয়েছিল উত্তমকুমারের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। এই বিয়ের ক্ষেত্রে মহুয়ার পাশে দাঁড়ানো ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের মধ্যে উত্তমকুমারও ছিলেন অন্যতম।
মহুয়ার অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ছিল তপন সিংহ পরিচালিত ‘আদমী ঔর ঔরত’। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই হিন্দি ছবিতে অমোল পালেকরের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি। বিহার ও বাংলার সীমান্ত এলাকায় ছবিটির শুটিং হয়েছিল এবং অল্প কয়েকজন শিল্পীকে নিয়েই কাজ হয়েছিল। শুটিংয়ের শেষ দিনে মহুয়া নিজের হাতে বাঙালি রান্না করে সকলকে খাইয়েছিলেন। পরে অমোল পালেকর জানিয়েছিলেন, কলকাতায় এলেই মহুয়ার কথা মনে পড়ে তাঁর মন খারাপ হয়ে যায় এবং এত বছর পরেও কলকাতাকে মহুয়ার স্মৃতি থেকে আলাদা করতে পারেননি তিনি। এই ছবিতে মুসলমান গর্ভবতী এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মহুয়া এবং তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়। শুরুতে রোগা হওয়ার কারণে ‘নয়া মিছিল’ থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতার পরে ‘আদমী ঔর ঔরত’ ছবিতে তাঁকে বেশি মোটা মনে করে বাদ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তপন সিংহ। তখন মহুয়া মাত্র তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিলেন এবং সেই সময়ের মধ্যে নিজের চেহারায় এমন পরিবর্তন আনেন যে পরে পরিচালক তাঁকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারেননি।
এই ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান তিনি, যদিও সেই স্বীকৃতি আসে তাঁর মৃত্যুর পরে। ‘দাদার কীর্তি’ ছবির সরস্বতী চরিত্রটিও মহুয়ার অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হয়ে রয়েছে। গম্ভীর অথচ সহজ সেই মেয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’ গানে তাঁর উপস্থিতি এখনও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। এই ছবির হাত ধরেই তাপস পালের অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ এবং প্রথমবার শুটিংয়ে এসে তাঁর ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা দেখে মহুয়া তাঁকে সাহস দিয়েছিলেন। মহুয়া তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, প্রথম দিকে সবারই এমন ভয় লাগে, পরে ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। এই ছবিতে মহুয়ার বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দেবশ্রী রায় এবং পর্দার সম্পর্কের বাইরেও দুজনের মধ্যে দিদি বোনের মতো ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গেও একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন মহুয়া, যার মধ্যে ছিল ‘অভিমান’, ‘লাল গোলাপ’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘শত্রু’ এবং ‘শঠে শাঠ্যং’।
‘অভিমান’ ছবির একটি দৃশ্যে রঞ্জিত মল্লিককে ক্রাচ দিয়ে মহুয়াকে আঘাত করার অভিনয় করতে হয়েছিল এবং শটের সময় অভিনেতা অনিচ্ছাকৃতভাবে বেশ জোরে আঘাত করে ফেলেন। রঞ্জিতের কথায়, শট শেষ হওয়ার পর সবাই বুঝতে পেরেছিলেন দৃশ্যটি কতটা কঠিন হয়েছিল, কিন্তু মহুয়া পুনরায় শট দিতে না হয় বলে কোনও শব্দ করেননি। তাঁর সেই একাগ্রতা দেখে রঞ্জিত মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং পরে তাঁর কাছে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন। সেই সময় মহুয়ার ব্যক্তিগত জীবনেও অশান্তি চলছিল বলে জানা যায় এবং তিলকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। শোনা যায়, স্বামীর মারধরের চিহ্ন পর্যন্ত লুকিয়ে তাঁকে কখনও কখনও শুটিং করতে যেতে হত। রঞ্জিত মল্লিকের কাছে দুঃখপ্রকাশের সময় মহুয়া নাকি বলেছিলেন, ‘‘রঞ্জিতদা, এর থেকেও বেশি জোরে মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।’’
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘কপালকুণ্ডলা’তেও তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় এবং অরণ্যবালা কপালকুণ্ডলার সরল দৃষ্টি ও অভিব্যক্তি এখনও দর্শকের মনে রয়েছে। তরুণ মজুমদার ও তপন সিংহের পাশাপাশি অগ্রদূতের ‘সূর্যসাক্ষী’, অগ্রগামীর ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘অজস্র ধন্যবাদ’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘কেনারাম বেচারাম’, পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রতিশ্রুতি’, সলিল দত্তের ‘বাবুমশাই’, ‘রাজেশ্বরী’ এবং আরও বহু ছবিতে কাজ করেছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর প্রায় দশ দিন হাসপাতালে জীবন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত চলে যান মহুয়া। মৃত্যুর সময় তাঁর হাতে ২২টি ছবির কাজ ছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে চারটির কাজ শেষ হয়েছিল, সাতটি ছিল অসম্পূর্ণ এবং আরও ১১টি ছবিতে তিনি শুধু চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। মৃত্যুশয্যায় বান্ধবী রত্না ঘোষালকে তাঁর ছেলে গোলা ওরফে তমালের খেয়াল রাখতে বলেছিলেন মহুয়া বলে জানা যায়।
আরও পড়ুনঃ “নাক কা’টাটা মেটাফোরিক্যাল, শি ওয়াজ ভায়ো*লেটেড!” লক্ষণের হাতে শ্লী*লতাহা’নির শিকার হয়েছিলেন শূর্পণখা, দাবি শোলাঙ্কি রায়ের? “আমার মতে হি ইজ ভেরি জেন্টলম্যান!” “আমার তো ওইরকম পুরুষই ভালো লাগে!” ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’ রাম নয়, সীতাকে হরণকারি রাবণকে কেন বললেন ‘ভদ্রলোক’ ও নীতিবান পুরুষ? ‘পোগোতিশিল মাকুভাম’, নেটপাড়ায় তীব্র রো*ষের মুখে ‘বামপন্থী’ অভিনেত্রী!
তাঁর মৃত্যুর পরে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলির মধ্যে ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ ও ‘অভিমান’ বিশেষ সাফল্য পায় এবং মহুয়ার সংলাপে কণ্ঠ দিয়েছিলেন অনামিকা সাহা। অনামিকা জানিয়েছিলেন, মহুয়ার সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব ছিল এবং মহুয়া তাঁর চোখ ও অভিনয়ের প্রশংসা করে ভবিষ্যতে ভালো অভিনেত্রী হওয়ার কথা বলতেন। তাঁর কথায়, ‘‘আজও মহুয়ার শেষ ছবিগুলি পর্দায় এলে এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। সেখানে মহুয়াকে দেখা যায়, অথচ তাঁর মুখে আমার কণ্ঠে সংলাপ শোনা যায়।’’ মহুয়ার মৃত্যুকে ঘিরে বলা হয়েছিল, ছেলের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে স্টোভ থেকে আগুন লেগেই এই দুর্ঘটনা ঘটে, যদিও সেই ব্যাখ্যা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। সেদিন সকাল থেকেই তিনি মদ্যপান করছিলেন বলেও দাবি ছিল এবং তিনি আগে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলেও শোনা যায়। ফলে তাঁর মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ ছিল, সেই রহস্য আজও পুরোপুরি কাটেনি। মহুয়ার মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তা অটুট, আর সেই জীবন, অভিনয় ও মৃত্যুর রহস্য নিয়েই প্রযোজক রানা সরকারের উদ্যোগে রাজদীপ ঘোষের পরিচালনায় তৈরি হচ্ছে ‘গুন গুন করে মহুয়া’।






