বিনোদন জগতের তারকারা শুধু পর্দার চরিত্র নন, তাঁদের জীবনদর্শন, মূল্যবোধ এবং অভিজ্ঞতাও সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহু মানুষ তাঁদের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে সম্মান ও সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে চলা শিল্পীদের বক্তব্য সমাজের নানা বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবন, অভিনয়, মাতৃত্ব, নারীর স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতা শংকর।
বাংলা চলচ্চিত্র ও নৃত্যজগতের অন্যতম পরিচিত মুখ মমতা শংকর। কয়েক দশক ধরে তিনি অভিনয় ও নৃত্যের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে চলেছেন। বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নাচ এবং অভিনয় দুটিই তাঁর কাছে সমান প্রিয়। এই দুই শিল্পমাধ্যমকে তিনি নিজের দুই সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, আজও নতুন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলে তিনি সমান উৎসাহ নিয়ে কাজ করেন। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর শেখার কোনও শেষ নেই।
সাক্ষাৎকারে নারীর স্বাধীনতা এবং মাতৃত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মমতা শংকর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, একজন মা যখন নিজের সন্তানকে স্তন্যপান করান, তার চেয়ে পবিত্র দৃশ্য আর কিছু হতে পারে না। সেই মুহূর্তে একজন নারীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মা। এই মাতৃত্বকে গর্বের সঙ্গে দেখা উচিত। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার অর্থ কখনও নিজের মর্যাদা বা আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেওয়া নয়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে তাঁর মত। তিনি বলেন, মেয়েদের নিজেদের সম্মান ও ব্যক্তিত্বকে সবসময় গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যাতে সমাজও তাঁদের সেই চোখেই দেখে। তাঁর কথায়, একজন নারীর নিজের চারপাশে এমন একটি ‘ডিগনিটির গণ্ডি’ থাকা প্রয়োজন, যা অন্যদেরও সম্মান করতে বাধ্য করবে।
মমতা শংকর আরও বলেন, সমাজে মেয়েদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত অন্য মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো। তাঁর মতে, একজন নারীর আচরণ অনেক সময় অন্য নারীদের সম্পর্কেও মানুষের ধারণা তৈরি করে। তাই প্রত্যেক মহিলার দায়িত্ব রয়েছে নিজের মর্যাদা ও মূল্যবোধ বজায় রাখার। তিনি জানান, তাঁর মা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে সবার সঙ্গে মিশতে হবে, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান কখনও হারানো যাবে না। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি একা কাজ করেছেন, ভ্রমণ করেছেন, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, কিন্তু কখনও কোনও খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। এর কারণ হিসেবে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব এবং আচরণকেই কৃতিত্ব দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্মান আদায় করে নিতে হয় না, নিজের ব্যবহার ও চরিত্রের মাধ্যমেই তা অর্জন করা যায়।
আরও পড়ুনঃ অদিতি মুন্সির মন জিততে বাড়িতে পৌঁছে যেত…, কীর্তনশিল্পীর জন্য রীতিমতো নাকের জলে চোখের জলে হয়েছিলেন দেবরাজ! শেষ পর্যন্ত কীভাবে বিয়ে হল? বিতর্কের মাঝেই সামনে এলো সেই অজানা অধ্যায়! অদিতিকে নিজের জীবনের সঙ্গী করতে কতদূর গিয়েছিলেন তিনি, জানলে চমকে যাবেন!
সাক্ষাৎকারে বর্তমান সমাজ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মমতা শংকর। তাঁর মতে, আজকের দিনে শিক্ষা এবং ধর্ম দুটি বিষয়কেই অনেক সময় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, প্রকৃত শিক্ষা শুধু স্কুল-কলেজে পাওয়া যায় না, বরং পরিবারের কাছ থেকেই একজন মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করে। একইভাবে ধর্ম মানে কুসংস্কার বা বিভাজন নয়, বরং মানবতা ও ভালোবাসা। তাঁর বিশ্বাস, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হল ভালোবাসা। ভালোবাসার মাধ্যমেই মানুষকে জয় করা সম্ভব। জীবনের শেষ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হল কোনওদিন যেন নিজের চোখে নিজে ছোট হয়ে না যান। আত্মমর্যাদা, মানবিকতা এবং ভালোবাসার এই বার্তাই তিনি সকলের কাছে পৌঁছে দিতে চান।






