রত্না ঘোষাল বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের এক পরিচিত এবং অভিজ্ঞ মুখ। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত এই অভিনেত্রী অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা ও ধারাবাহিকে কাজ করেছেন। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের নতুন ছবি ‘জয়িতা’ নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি, অভিনয় জীবন এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করেন। তাঁর কথায়, ‘জয়িতা’ শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং একাকী জীবনযাপন করা প্রবীণ মানুষদের আবেগ, সম্পর্ক এবং বাস্তব জীবনের গল্পকে তুলে ধরবে। ছবির গল্প ও নিজের চরিত্র নিয়ে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী।
সাক্ষাৎকারে রত্না ঘোষাল স্পষ্ট করে জানান, অনেকেই মনে করেন তিনি অভিনয় থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। তবে সেই ধারণা সঠিক নয়। তিনি বলেন, নিয়মিত মেগা সিরিয়াল করা বন্ধ করলেও সিনেমা, বিজ্ঞাপন এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজ তিনি চালিয়ে গিয়েছেন। দর্শকরা আগে প্রতিদিন টেলিভিশনে তাঁকে দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন বলেই এখন তাঁকে কম দেখলে মনে হয় তিনি কাজ করছেন না। সম্প্রতি বিভিন্ন ছবিতে কাজ করার পাশাপাশি ‘জয়িতা’ ছবির শুটিংও করেছেন তিনি। তাঁর মতে, দর্শকদের সামনে কম আসলেও অভিনয়ের জগৎ থেকে তিনি কখনও সরে যাননি।
বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থা নিয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেন অভিনেত্রী। তাঁর বিশ্বাস, দর্শক এখনও পারিবারিক গল্পভিত্তিক সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন। আগে যেমন পরিবার, সম্পর্ক, মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনকে কেন্দ্র করে সিনেমা তৈরি হতো, সেই ধরনের আবেগঘন গল্প এখন অনেক কম দেখা যায়। রত্না ঘোষালের মতে, বর্তমান সময়ের অনেক ছবি প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও সেগুলো অনেক সময় দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে না। তিনি বলেন, একটি ভালো সিনেমা এমন হওয়া উচিত যা হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও মানুষের মনে থেকে যায়। দর্শক যেন বাড়ি ফিরে ছবির গল্প নিয়ে ভাবেন, সেই আবেগই সিনেমার আসল শক্তি।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মহানায়ক উত্তম কুমারকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ। রত্না ঘোষাল জানান, অভিনয়ের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় তিনি উত্তম কুমারের কাছ থেকেই শিখেছেন। উত্তম কুমার শুধু নিজের অভিনয় নিয়ে ভাবতেন না, সহ-অভিনেতাদেরও সমান গুরুত্ব দিতেন। কোনও দৃশ্য আরও ভালোভাবে কীভাবে করা যায়, তা তিনি ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন। রত্না ঘোষালের কথায়, বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিল্পীর মধ্যে সেই মানসিকতা দেখা যায় না। তিনি এমনও দাবি করেন, একবার একটি ছবিতে তাঁর অভিনীত গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য পরে বাদ দেওয়া হয়েছিল, কারণ সহ-অভিনেতা মনে করেছিলেন সেই দৃশ্যে তিনি বেশি প্রশংসা পেতে পারেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন এবং বলেন, শিল্পী হিসেবে সবাইকে একসঙ্গে ভালো কাজ করার মানসিকতা থাকা উচিত।
আরও পড়ুনঃ “একসময় ভেবেছিলেন আমার স্বপ্ন হয়তো পরের প্রজন্ম পূরণ করবে” ১৩ বছরের অপেক্ষা, কনস্ট্রাকশন সাইটের ধুলো মেখেই আগলে রেখেছিলেন গানের ভালোবাসা! অসম্ভবকে সম্ভব করে সারেগামাপার গ্র্যান্ড ফিনালেতে বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তীর অবিশ্বাস্য যাত্রা! শেষ হাসিটা কি তিনিই হাসবেন?
সাক্ষাৎকারের শেষে নতুন প্রজন্মের পরিচালক ও নির্মাতাদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তাও দেন রত্না ঘোষাল। তাঁর মতে, শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা না ভেবে আবেগ, সম্পর্ক এবং পারিবারিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে আরও বেশি সিনেমা তৈরি করা দরকার। তিনি বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত উপন্যাসগুলো থেকেও চলচ্চিত্র নির্মাণের পরামর্শ দেন। তাঁর বিশ্বাস, শক্তিশালী গল্প এবং মানবিক আবেগের মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে বাংলা সিনেমা আবারও দর্শকের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন পরিচালকরা ভালো গল্প বেছে নিয়ে কাজ করলে বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিন আবার ফিরে আসবে।






