রুপোলি পর্দার মহানায়িকাও রেহাই পাননি কুসংস্কারের হাত থেকে! দিবানাথের সঙ্গে বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জন্ম ফুটফুটে পুত্রসন্তানের, তারপর কী এমন হয় সেই শিশুর যে শ্বশুরবাড়িতে অভিনেত্রীকে শুনতে হয়েছিল ‘অপয়া’ অপবাদ? প্রথম সন্তানকে নিয়ে সুচিত্রা সেনের জীবনের বেদনাদায়ক অধ্যায় আজও রয়ে গিয়েছে আড়ালে?

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পর্দায় উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। কিন্তু রুপোলি পর্দার সেই স্বপ্নসুন্দরীর ব্যক্তিগত জীবন যে একেবারেই সুখের ছিল না, তা অনেকেরই অজানা। সাধারণত সুচিত্রা সেনের একমাত্র সন্তান হিসেবে মুনমুন সেনের নামই উঠে আসে। কিন্তু মুনমুনের জন্মের আগে আরও এক সন্তানের মা হয়েছিলেন মহানায়িকা। বিয়ের প্রায় এক বছরের মাথায় একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত, জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনা ঘিরে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে নানা কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছিল সুচিত্রাকে। এমনকী, তাঁকে ‘অপয়া’ বলেও দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে শোনা যায়। যে সংসারে নতুন বউ হিসেবে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি, সেখানেই সন্তানের মৃত্যু তাঁকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।

বিয়ের আগে সুচিত্রা সেনের নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। বাংলাদেশের পাবনায় জন্ম তাঁর। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত এবং মা ইন্দিরা দাশগুপ্তের সংসারে ভাইবোনদের সঙ্গে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। একবার পরিবারের সঙ্গে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলেন রমা। সেখানেই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার দিবানাথ সেনের ঠাকুরমার নজরে পড়েন তিনি। দিবানাথের জন্য রমাকেই উপযুক্ত জীবনসঙ্গী বলে মনে হয়েছিল তাঁর। এরপর দুই পরিবারের উদ্যোগে বিয়ের কথাবার্তা এগোয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েতে রাজি হতে হয়েছিল রমাকে। ১৯৪৭ সালে শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পর ঢাকার পরিচিত পরিবেশ, বাবা-মা এবং ভাইবোনদের ছেড়ে কলকাতার ৩৬ নম্বর বালিগঞ্জ প্লেসের বিশাল বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন তিনি। বাইরে থেকে বনেদি ও সমৃদ্ধশালী পরিবার মনে হলেও, নতুন সংসারে মানিয়ে নিতে বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন রমা। পরিচিত মানুষদের ছেড়ে নতুন পরিবেশে তাঁর দিন কাটত মনখারাপের মধ্যেই।

সুচিত্রার জীবনের সেই সময়টা আরও কঠিন হয়ে ওঠে প্রথম সন্তানকে হারানোর পর। পরিবারের তরফে তাঁকে কটাক্ষ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, স্ত্রীকে বাড়িতে বসিয়ে খাওয়াতে রাজি ছিলেন না দিবানাথ। শোনা যায়, স্ত্রীর সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জনের কথা ভেবেই তাঁকে অভিনয়ের জগতে নিয়ে আসেন তিনি। যদিও সুচিত্রা নিজে কখনও অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। পরিস্থিতির চাপে এবং সংসারের প্রয়োজনেই তাঁকে সিনেমার জগতে পা রাখতে হয়েছিল। স্বামীর হাত ধরেই প্রথম স্টুডিয়োপাড়ায় পৌঁছন রমা। এরপর ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর পরিচয়। রমা দাশগুপ্ত হয়ে ওঠেন সুচিত্রা সেন। বাংলা সিনেমার পর্দায় তাঁর আত্মপ্রকাশের পর দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় বিপুল জনপ্রিয়তা। একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন তিনি। কিন্তু পর্দার সাফল্যের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই তখনও চলছিল।

একসময় উত্তমকুমারের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের জুটি বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হয়ে ওঠে। তাঁদের অভিনয়ের রসায়ন দর্শকদের মন জয় করলেও, ব্যক্তিগত জীবনে সেই জনপ্রিয়তা দাম্পত্যের অশান্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল বলে শোনা যায়। স্ত্রীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইতেন দিবানাথ। কিন্তু অভিনয়ের মাধ্যমে সুচিত্রা যখন নিজের পরিচিতি, অর্থ এবং জনপ্রিয়তা তৈরি করে ফেলেন, তখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর পর্দার সম্পর্কও স্বামীর পছন্দ ছিল না বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল। অন্যদিকে, সুচিত্রার উপার্জনের টাকাও দিবানাথ নিজের হাতে রাখতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটা সময় মহানায়িকা স্বামীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে নিজের মতো করে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের দাম্পত্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও দুজনে আলাদা থাকতে শুরু করেন। বাইরে থেকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনো সুচিত্রার সংসারের ভিতরে যে এত অশান্তি চলছিল, তা সহজে বুঝতে পারেননি তাঁর অনুরাগীরা।

স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলেও নিজের মূল্যবোধ থেকে সরে আসেননি সুচিত্রা। দিবানাথের সঙ্গে আলাদা থাকার পরও নতুন কোনও সম্পর্কে জড়ানোর পথে হাঁটেননি তিনি। একাই মেয়ে মুনমুনকে বড় করে তোলেন। মেয়ের বিয়ের জন্যও নিজেই পাত্র খুঁজেছিলেন মহানায়িকা। রাজপরিবারের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেন তিনি। মুনমুনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিতেও মায়ের ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। অন্যদিকে, ১৯৬৯ সালে স্বামী দিবানাথের মৃত্যুর খবর পান সুচিত্রা। সেই সময় তিনি পরিচালক সুশীল মুখোপাধ্যায়ের ‘মেঘ কালো’ ছবির শুটিং করছিলেন। শোনা যায়, শুটিং চলাকালীনই স্বামীর মৃত্যুসংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছয়। দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেও খবরটি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। একটি পুরনো বিনোদনমূলক পত্রিকার উল্লেখ অনুযায়ী, সেই মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন, “আমার জীবনের একটা চাবি হারিয়ে গেল।” স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের হাতে সিঁদুর মুছে ফেলেছিলেন বলেও জানা যায়। ব্যক্তিগত জীবনের এত আঘাতের পরেও অভিনয়ের প্রতি দায়িত্ববোধে কোনও ঘাটতি রাখেননি তিনি।

আরও পড়ুনঃ “মঞ্চে ঢোকার দু’সেকেন্ডেই চমকে দিয়েছিল, ভুলে গিয়েছিলাম ওর পরিচয়!” “রোগা আর ফর্সা হলেই সুন্দরী, কে বানিয়েছে এই নিয়ম?” সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে গেলে চাই নিখুঁত ফিগার ও উজ্জ্বল ত্বক? সোহিনী সেনগুপ্তর অভিনয়ের কাছে কীভাবে হার মেনেছিল মিথ্যে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা? সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে সমাজকে আয়না দেখালেন মানসী সিনহা!

পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে সরিয়ে নেন সুচিত্রা সেন। একসময় যাঁর অভিনয় দেখার জন্য সিনেমা হলে ভিড় জমাতেন দর্শকরা, সেই মহানায়িকা জীবনের শেষ কয়েক দশক প্রায় সম্পূর্ণ অন্তরালেই কাটিয়েছিলেন। মেয়ের সংসার এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়েই থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ঠিক কী কারণ ছিল, তা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও নিজের ব্যক্তিগত পরিসরকে বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন সুচিত্রা। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময়ও শেষবারের মতো তাঁকে দেখার সুযোগ পাননি সাধারণ অনুরাগীরা। পর্দায় দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বাধীনচেতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করা সুচিত্রার নিজের জীবনেও ছিল বহু না বলা কষ্ট। প্রথম সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা, শ্বশুরবাড়ির কটাক্ষ, দাম্পত্যের অশান্তি এবং একা হাতে মেয়েকে বড় করে তোলার লড়াই, সবকিছু সামলেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। তাই মহানায়িকার জীবনের এই অধ্যায় আজও তাঁর অভিনয় জীবনের আড়ালে থাকা এক বেদনাদায়ক বাস্তব।

You cannot copy content of this page